শুক্রবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৭ খ্রীষ্টাব্দ | ১ পৌষ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ |
শিরোনাম
ওসমানীনগরে প্রবাসীর বাড়িতে দুর্ধর্ষ ডাকাতি  » «   ইলিয়াস আলীর বাড়িতে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা দুলু, মেয়র আরিফ  » «   দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী  » «   তিন মামলায় আপন জুয়েলার্সের মালিকদের জামিন  » «   একজন অভিজ্ঞ স্টাফ রিপোর্টার আবশ্যক  » «   গুজরাটে মোদী’র অগ্নিপরীক্ষা  » «   বিক্ষোভে উত্তাল ফিলিস্তিন ইসরায়েলি সেনাদের গুলিতে দুই ফিলিস্তিনি নিহত, আহত শতাধিক  » «   দেশের মানুষকে আন্ডারইস্টিমেট করবেন না: মির্জা ফখরুল  » «   ব্রিটিশ বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল এন্ড কলেজের ২০ বছর পূর্তি  » «   রেসিপিঃজলপাইয়ের টক-মিষ্টি আচার  » «   রসুন সবজি নাকি মসলা, জানতে আদালতে মামলা  » «   জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানীর স্বীকৃতি বিশ্বজুড়ে প্রত্যাখ্যান  » «   পেট্রোলপাম্প ওনার্স এসোসিয়েশন সিলেটের বার্ষিক সাধারণ সভা  » «   ভারত থেকে কয়লা আমদানী পুনরায় চালু  » «   বড়লেখায় গৃহবধূ হত্যা: স্বামীসহ গ্রেফতার ২  » «  

সংঘর্ষতত্ত্ব

তানভীর অাহমদ

[১]

খ্রিস্টেরও জন্মের ৩৫০ বছর আগের গ্রিস। সেসময়ে জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রবিন্দু। জ্ঞান গরিমায় পর পর সক্রেটিস, প্লেটোর পর গ্রিসে জ্ঞানচর্চায় আরেকটি নাম ধ্বনিত হচ্ছে, অ্যারিস্টটল। দর্শন, যুক্তিবিদ্যা, জীববিজ্ঞান, পৌরনীতি সব… সবকিছুতেই যেন অ্যারিস্টটলের কিছু না কিছু বলার আছে।

সাধারণ মানুষের খেটে খাওয়া জীবনে জ্ঞানচর্চার সময় অপ্রতুল, ইচ্ছে থাকলেও খরচাপাতির কারণে সেটা যেন উচ্চবিত্তদের জন্যই বরাদ্দ। কিন্তু জ্ঞানীদের ধ্যানধারণার খোঁজখবর তারা রাখে। অ্যারিস্টটল জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে টলেমি আর প্লেটোর সাথে মিল রেখে নিজের মতামত ব্যক্ত করলেন। আর তা হলঃ পৃথিবী মহাবিশ্বের কেন্দ্রে, সূর্যসহ অন্যান্য গ্রহ আর মহাজাগতিক বস্তু পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরছে।
.
প্রথম শতাব্দী, চলছে বাইবেলের সংকলনের কাজ। এখনও দাপটের সাথে টিকে আছে গ্রিক জ্ঞানগরিমা। এতই দাপট যে গ্রিক ভাষাই তখন সভ্য পৃথিবীর ভাষা। তাই প্রাচীন হিব্রুতে না করে গ্রিক ভাষাতেই নতুন সংকলন চলছে। বাইবেলে চলে এল জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে প্লেটো-অ্যারিস্টটলদের ‘জিওসেন্ট্রিক’ মতবাদ অর্থাৎ, পৃথিবী মহাবিশ্বের কেন্দ্রে রয়েছে সেকথা। তাও একটি দু’টি জায়গায় নয়। রীতিমত চার-পাঁচ জায়গায়। (Chronicles 16:30, Psalm 93:1, Psalm 96:10, Psalm 104:5, Ecclesiastes 1:5)
.
ষষ্ঠ শতাব্দীর আরব। মরুভূমির ভেতর একজন দাবি করলেন সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে সর্বশেষ নবুওয়্যাতের। নাম মুহাম্মাদ ﷺ. বাইবেল সংকলকদের মত লেখাপড়া জানা মানুষ নন। কিন্তু তিনি বলছেন অশ্রুতপূর্ব সব বাণী… আরবি জেনেও আরবরা মুগ্ধ। আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত শেষ আসমানি কিতাব ‘আল-কুরআন’ নিয়ে এসেছেন তিনি।

আল কুরআনে খ্রিস্টানদের কিতাব বিকৃতির কথা এল। অর্থাৎ, খ্রিস্টানরা তাদের জন্য প্রেরিত কিতাবে নিজ থেকে মনগড়া গল্প, সংযোজন, বিয়োজন যা পেরেছে করেছে। পূর্ববর্তী নবী রাসূল আর ঈমানদারদের ঘটনার পাশাপাশি মানব সৃষ্টিরহস্য, মহাবিশ্বের সৃষ্টিরহস্য সবকিছু নিয়েই আয়াত এল। কিন্তু সেই গল্প আরেকটু পর হলেই বরং উত্তম।
.
[২]

প্রায় সহস্র বছর পরের কথা। ১৬৩৩ সাল। ক্যাথোলিক চার্চ থেকে ধর্মদ্রোহিতার অভিযোগ এল ইতালিয়ান পলিম্যাথ, জ্যোতির্বিদ ও বিজ্ঞানী গ্যালেলিও গ্যালেলির নামে, যাকে আগে কয়েকবার সতর্ক করে দেওয়া হয়েছিল।

১৬০৯ এ বিজ্ঞানী কেপলারের Astronomia nova প্রকাশিত হয়। সেখানে বাইবেলের শিক্ষার বিরুদ্ধে গিয়ে বিজ্ঞানী কোপার্নিকাসের দেওয়া ‘হেলিওসেন্ট্রিক থিউরি’ এর পক্ষে ছিল সমর্থন। ঠিক পরের বছরই বের হয় গ্যালেলিওর Sidereus Nuncius, যেখানে ছিল গ্যালেলিওর নিজের বানানো টেলিস্কোপের প্রাথমিক অবজারভেশনগুলো। বইটিতে কেবল ইঙ্গিতেই সীমাবদ্ধ থাকলেও এর পরপরই বিজ্ঞানী গ্যালেলিও কোপার্নিকাসের হেলিওসেন্ট্রিক মতবাদের প্রতি জোরালো সমর্থন শুরু করেন। কেবলই মতবাদ নয়, বরং তা সত্য হিসেবে প্রচার শুরু করেন।
.
এদিকে চার্চগুলো স্রেফ হাইপোথিসিস হিসেবে এতকাল হেলিওসেন্ট্রিক থিউরির তেমন বিরোধিতা না করলেও ফ্যাক্ট হিসেবে প্রচার দেখেই তাদের মাথা খারাপ হয়ে যায়। এর মূল কারণ ছিল বাইবেলের সেই আয়াতগুলো যেগুলো ‘পৃথিবী কেন্দ্রে আর সূর্যসহ অন্যান্য গ্রহগুলো পৃথিবীর চারপাশে ঘুরছে’ তথা জিওসেন্ট্রিক মতবাদকেই সমর্থন করে।
.
ক্যাথলিক চার্চ তাদের অবস্থান, ক্ষমতা ও অহমিকা প্রমাণ করেছিল ১৬০০ খ্রিস্টাব্দে আরেক বিজ্ঞানী জিওর্দানো ব্রুনোকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করে। সেই একই কারণে… ব্রুনোও বলেছিল পৃথিবী নয় বরং সূর্যই কেন্দ্রে রয়েছে। জ্ঞানচর্চার যুগে বাইবেলের অনুসারীরাও যে কমবেশি রিজনিং আর কম্পেয়ার বেসড প্রচার-প্রসারে মেতে উঠেছিল তারই ফল ছিল এই ঘটনা। কেননা গ্রিক ভাষায় সংকলনের সময় সলিড ফ্যাক্ট হিসেবে জানা জিওসেন্ট্রিক মতবাদ সমর্থন করে এমনসব ভার্স ঢুকিয়ে পরবর্তীতে ফায়দা লুটা হয়েছিল অনেক। ‘এই দেখ বাইবেল আধুনিক জ্ঞান সম্মত’ ধরনের প্রচারণায় উক্ত ভার্সগুলো হরহামেশাই আনা হতো। তাই গ্যালেলিও যখন আগের শতাব্দীতে কোপার্নিকাসের দেওয়া ‘হেলিওসেন্ট্রিক মতবাদ’ নতুন করে ফ্যাক্ট হিসেবে প্রচার শুরু করেছিলেন, তখন তা এড়িয়ে যাবার উপায় ছিল না মোটেও। কেননা সাধারণেরাও দিব্যি জানতো যে তা বাইবেলের শিক্ষার বিরোধী হয়ে যাচ্ছে।
.
এমতাবস্থায় গ্যালেলিও যখন আবারও হেলিওসেন্ট্রিক মতকে সত্য প্রচারে নামেন তখন ক্যাথলিক চার্চের মাথা বিগড়ে যায়। ঘটনাক্রমে গ্যালেলিও নিজ ছাত্র Benedetto Castelli কে একটি চিঠি লিখেন যেখানে বাইবেলের ব্যাপারে ‘গ্যালেলিওর দৃষ্টিভঙ্গি’ উল্লেখ ছিল। পরবর্তীতে ১৬১৫ সালে এসে “Letter to The Grand Duchess Christina” নামে একটি খোলাচিঠি লিখেন যেখানে গ্যালেলিও নিজের মতামত শক্ত করে ব্যক্ত করার পাশাপাশি নিজেকে একজন ক্যাথলিক ধর্মভীরু হিসেবেও উল্লেখ করেন। সাথে তিনি বাইবেলের ভার্সগুলোর ভিন্ন ব্যাখ্যা থাকবার সম্ভাবনাও উল্লেখ করেন। এই চিঠির ব্যাপারটি রাতারাতি দিগ্বিদিক ছড়িয়ে যায়।
.
সেই চিঠির পরই মূলত গ্যালেলিওর উপর ক্যাথলিক চার্চের খড়গ নেমে আসে। গ্যালেলিওকে হেলিওসেন্ট্রিক মতবাদ প্রচার থেকে কড়াভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। সেই সাথে নিষিদ্ধ করা হয় কোপার্নিকান সকল লিখা ও বই। ১৬১৬ সালে ক্যাথলিক চার্চ হেলিওসেন্ট্রিজমকেই নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
.
এমনসব ঘটনার পর গ্যালেলিও রোমে চলে যান এবং এসব বিষয়ে নীরবতা অবলম্বন করতে থাকেন। কিন্তু কালক্রমে ১৬২৩ সালে পোপ পরিবর্তন হয়ে নতুন পোপ Pope Urban VIII আসে, যে কিনা গ্যালেলিওর ভক্ত ও অনুরাগী ছিলেন। তাই গ্যালেলিও এই সুযোগে আরেকটি বই লিখেন যা ১৬৩৩ সালে প্রকাশিত হয়। বইটির নাম “Dialogue Concerning the Two Chief World Systems” যেখানে তিনজন ব্যক্তির আলাপচারিতা আকারে টলেমি আরিস্টটলদের জিওসেন্ট্রিজমের অসাড়তা ও কোপার্নিকান হেলিওসেন্ট্রিজমের যৌক্তিকতা উল্লেখ করা হয়। বইটির তিনটি চরিত্রের একটি চরিত্র ছিল টলেমি-আরিস্টটলদের জিওসেন্ট্রিজমে বিশ্বাসী, আরেকটি চরিত্র ছিল হেলিওসেন্ট্রিজমে বিশ্বাসী আর শেষ চরিত্রটি ছিল নিরপেক্ষ জ্ঞানী।
.
পরোক্ষভাবে এইরূপ প্রচারেও গ্যালেলিওর শেষ রক্ষা হয় নি। ক্যাথলিক চার্চ থেকে এবার ধর্মদ্রোহিতার অভিযোগ এনে গ্যালেলিওকে আজীবন কারাদন্ড দেওয়া হয়। তবে শারীরিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে গৃহবন্দী করে রাখার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হয়। গৃহবন্দী অবস্থাতেই ১৬৪২ সালের জানুয়ারিতে গ্যালেলিও মারা যান।
.
[৩]

ক্যাথলিক চার্চের সাথে বিজ্ঞানী গ্যালেলিও গ্যালিলির সংঘর্ষময় ঘটনাপ্রবাহ ‘Galileo affair’ নামে পরিচিত। একইসাথে এটি পরবর্তী বিজ্ঞানচর্চাকারী ও বিজ্ঞান অনুরাগীদের এক অনুপ্রেরণা হয়ে উঠে। কিন্তু কোপার্নিকাস, কেপলার আর গ্যালেলিওদের মতবাদে সূর্যকে কেন্দ্রে মনে করার বিষয়টি থাকলেও সূর্যকে মহাবিশ্বের কেন্দ্র ও স্থির হিসাবে বিবেচনা করা হয়েছিল।
.
আল্লাহ রব্বুল আ’লামীন বলেন, “তিনিই সৃষ্টি করেছেন রাত্রি ও দিন এবং সূর্য ও চাঁদ। সমস্তকিছুই আপন আপন কক্ষপথে বিচরণ করে।” (সূরা আম্বিয়া, ২১: ৩৩)”
.
উক্ত আয়াতে ‘বিচরণ করা’ অর্থে ব্যবহৃত শব্দটি হল ‘ইয়াসবাহুন’ যা কিনা ‘সাবাহা’ শব্দটি থেকে এসেছে। আর ‘সাবাহা’ শব্দটি Motion বা Change in Position অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। অর্থাৎ, শব্দটি কোন মাটিতে চলা ব্যক্তির ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হলে বুঝতে হবে সে হাঁটছে অথবা দৌঁড়াচ্ছে। শব্দটি পানিতে থাকা কোন লোকের ক্ষেত্রে বলা হলে এর অর্থ এই না যে লোকটি ভাসছে, বরং বুঝতে হবে লোকটি সাঁতার কাটছে। অর্থাৎ সে তার অবস্থানের পরিবর্তন করছে। আর শব্দটি কোন মহাজাগতিক বস্তুর (Celestial body) ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হলে এর অর্থ হয় তা স্থির নেই, বরং গতিশীল!
.
এছাড়াও আল্লাহ রব্বুল আলামীন বললেন ‘সমস্তকিছু’! অর্থাৎ, সমস্ত মহাজাগতিক বস্তু (celestial body) – পৃথিবী, চাঁদ, সূর্য, অন্যান্য গ্রহ-উপগ্রহ, অন্যান্য নক্ষত্ররাজি, গ্যালাক্সিসমূহ কোনোকিছুই বাদ নয়। আজ ক্লাস নাইন টেনের সায়েন্স স্টুডেন্টরাও জানে পরম স্থিতি বা পরম গতি বলতে কিছু নেই কারণ মহাবিশ্বের সকল কিছুই প্রকৃতপক্ষে গতিশীল। অতি সাম্প্রতিক গবেষণায় সূর্যের নিজ অক্ষে ঘূর্ণন ও কক্ষপথ দিয়ে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে আবর্তনের ব্যাপারটি স্পষ্ট। সূর্য প্রায় ২৫ দিনে নিজ অক্ষে ঘূর্ণন সম্পন্ন করে আর প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ২৫১ কি.মি. বেগে মোট ২২৫ থেকে ২৫০ মিলিয়ন বছরে Milkyway Galaxy এর কেন্দ্রের চারদিকে আবর্তিত হয়। আবার Milkyway Galaxy ও নিকটতম Andromeda galaxy ও স্থির নেই। উভয়ই দুর্দান্ত গতিতে নিকটতম Virgo Cluster বা গ্যলাক্সিপুঞ্জের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
.
কুরআনের কোথাও ‘পৃথিবী স্থির’ একথা বলা হয় নাই। অথচ বাইবেলের প্রায় পাঁচটি জায়গায় সুস্পষ্টভাবে ‘পৃথিবী স্থির’ ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু কুরআনের এই মু’জিযা আগেও আলোচিত হয়েছে বহুবার। আর বর্তমান প্রেক্ষাপটে এর চেয়েও চিন্তা উদ্রেককারী গুরুত্বপূর্ণ কিছু ব্যাপার আড়ালেই থেকে গেছে বারবার। সেই সাথে অধিকাংশ সময় আড়ালেই থেকে গেছে আমাদের জ্ঞানচর্চার কিছু মূলনীতি।
.
[৪] Conflict Thesis

Conflict Thesis হল ধর্ম ও বিজ্ঞানের মৌলিক চিন্তাগত সংঘর্ষকে আবশ্যক ধরে নিয়ে করা ইতিহাসভিত্তিক পর্যালোচনা। শব্দগতভাবে নতুন হলেও ব্যাপারটি নাস্তিক্য ও সেক্যুলার সমাজে অল্প সময়েই জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং New Atheism এর ভিত্তিতে পরিণত হয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর (১৮০১-১৯০০) দ্বিতীয়ার্ধে প্রাণসৃষ্টির ব্যপারে খ্রিস্টীয় পাদ্রীদের সাথে বিজ্ঞানমহলের নতুন করে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। ১৮৭০ এর দিকে সেই দ্বন্দ্ব তুঙ্গে উঠে। এমতাবস্থায় John William Draper নামে একজন বিজ্ঞানী সেই পুরনো Galileo affair কে ভিত্তি বানিয়ে এক থিসিস লিখে ফেলেন যা ১৮৭৪ এThe Warfare of Science নামে বই আকারে প্রকাশিত হয়। ‘প্রাণসৃষ্টি’-কে কেন্দ্র করা এবারের দ্বন্দ্বে ডারউইনের ইভল্যুশন সমর্থনকারীরা প্রমাণ, গবেষণা ও যৌক্তিকতায় না হেঁটে ক্যাথলিক চার্চের ঐতিহাসিক নির্যাতনের আলোচনায় মোড় ঘুরিয়ে দেয়। জনপ্রিয় হয় Conflict Thesis. আর ‘Apeal To Emotion’ ফ্যালাসির ফাঁদে পা দিয়ে জন্ম হয় সায়েন্টিজমের।
.
সূর্যকে কেন্দ্রে ধরা হলেও একইসাথে ‘স্থির’ ও ক্ষেত্রবিশেষে ‘মহাবিশ্বেরই কেন্দ্রে’ দাবি করে কোপার্নিকাস, ব্রুনো আর গ্যালিলিওরা ডাহা ভুল করেছিলেন। কিন্তু তবুও তাদের অবদান কেন এতটা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা? অনেকে ভাবতে পারেন সেই সময়ে আরও আধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে অবজারভেশন সম্ভব হয় নি। এটা সত্য হলেও মূল কারণ ছিল না। মূল কারণ ছিল এই বিজ্ঞানীদের ত্যাগ স্বীকারের ব্যাপারটি। ক্যাথলিক চার্চ থেকে অকথ্য নির্যাতনের সম্ভাবনার কথা জেনেও নিজেদের বিশ্বাসের প্রতি তারা অটল ছিলেন। জিওদার্নো ব্রুনোকে তো The Martyr of Science নামেও অভিহিত করা হয়। একারণে সুর্য স্থির বলে ভুল করলেও বিজ্ঞানী, বিজ্ঞান চর্চাকারী ও অনুরাগীদের অনুপ্রেরণা হয়ে যান ব্রুনো-গ্যালেলিওরা। কিন্তু সত্য খোঁজার অনুপ্রেরণা না হয়ে ব্যাপারটিকে ‘ধর্ম ও বিজ্ঞানের চিরন্তন বিদ্বেষ’ এ নিয়ে যাওয়া তো স্পষ্ট বাড়াবাড়ি, স্পষ্ট ভ্রান্তি।
.
Conflict Thesis এ Galileo affair এর পর ক্রমে ক্রমে Flat Earth vs Spherical Earth দ্বন্দ্ব এবং শেষে Evolutionism vs Creationism এর আলোচনা করা হয়। এখানে উল্লেখযোগ্য বিষয় কয়েকটি।
.
এক. রোমান ক্যাথলিক চার্চের সাথে হওয়া ঐতিহাসিক দ্বন্দ্বগুলোর বরাত দিয়ে ‘সকল ধর্মের’ সাথেই বিজ্ঞানের চিরন্তন দ্বন্দ্বের এক নীলনকশা আঁকা হয়েছে। এমনকি Draper এর সর্বপ্রথম থিসিসেও ইসলামের কথা বাদ যায় নি।
.
দুই. কোনোবিষয়ে বিজ্ঞান ও ধর্মের অমিল হলে সিস্টেমনির্গত বিজ্ঞানীদেরকেই সর্বদা সত্য আর বিজ্ঞানকে সুপিরিয়র বলে চালিয়ে দেওয়ার এক মানসিকতা রচনা করা হয়েছে। এবং আজ অবধি তা চালু রয়েছে। Hollywood এর সিনেমা থেকে শুরু করে দেশীয় জাফর ইকবালদের ‘একটুখানি বিজ্ঞান’ সমস্ত মাধ্যমেই তা স্পষ্ট হয়।
.
তিন. যেহেতু এক শ্রেণীর আস্তিকদের সাথেই দ্বন্দ্ব হয়েছিল, তাই আস্তিকতার দিকে যায় এমনসব বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও ফলাফল কঠোরভাবে দমন করা শুরু হল। আর নাস্তিক্যবাদী হাইপোথিসিসগুলোকে বৈজ্ঞানিক সত্য বলে প্রচার করা শুরু হল। গ্লোবাল সায়েন্টিফিক কমিউনিটিগুলোই ধীরে ধীরে নাস্তিকতার সিস্টেমে পড়ে গেল।
.
[৫]

ধর্ম ও বিজ্ঞানের সংঘর্ষ লাগিয়ে রাখার ব্যাপারটি কি সীমা অতিক্রম করে ফেলেছে? সায়েন্টিফিক কমিউনিটিগুলোর এখনকার অবস্থাই বা কেমন? বিজ্ঞানীদের কেউ কি এখনও বৈষম্য ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন? এই প্রশ্নগুলো গুরুত্বপূর্ণ। এবং এগুলোর উত্তর খুঁজতে গেলেই পাওয়া যায় গ্লোবাল সিস্টেমের আসল রূপ।
.
Dr. Richard Von Sternberg হলেন Molecular Evolution এবং Theoritical Biology তে আলাদাভাবে Phd করা একজন বিজ্ঞানী। ৩০ টিরও উপর Peer Reviewed সায়েন্টিফিক বই ও জার্নালে তার লিখা বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়। এতকাল কোনো সমস্যা না হলেও ২০০৪ সালের আগস্টে তার দায়িত্বে আরেকটি Peer Reviewed Article প্রকাশিত হয়। আর্টিকেলটির মূল লেখক ছিলেন Stephen C. Meyer যিনি নিজেও কেম্ব্রিজ ইউনিভার্সিটি থেকে PhD করা এবং Discovery Institute এর একজন সিনিয়র ডিরেক্টর। আর্টিকেলটির নাম ছিল “The Origin of Biological Information and the Higher Taxonomic Categories”। সেখানে প্রাণসৃষ্টির আণবিক গঠন অত্যন্ত জটিল বলে ডারউইনিইয়ান ইভোল্যুশন এর বদলে “intelligent design” এর সম্ভাবনার কথা হয়েছিল আর বিজ্ঞানী Sternberg এর হাত ধরেই তা প্রকাশিত হয়েছিল।
.
কিন্তু আর্টিকেলটি প্রচারের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই Smithsonian Institution যা কিনা ওই জার্নালটির ফান্ডিং করতো, সেখানকার সিনিয়র বিজ্ঞানীরা ড. Sternberg কে অযোগ্য, ধর্মান্ধ নানা ভাষায় অপদস্থ করা শুরু করেন। বিজ্ঞানী Sternberg কে টাকা খেয়ে একাজ করেছেন, খ্রিস্টীয় স্লিপার সেল অপারেটিভ – নানারকম অপবাদ দেওয়া হয়। Creationism এর পক্ষে যায় – কেবল এমন আর্টিকেলের অনুমতি দেওয়াতেই বিজ্ঞানী Sternberg এর উপর সায়েন্স কমিউনিটিগুলোর খড়গ নেমে আসে। (১)
.
ইংল্যান্ডের Southampton থেকে Cell Biology তে PhD করা Dr. Caroline Crocker ভার্জিনিয়ার George Mason বিশ্ববিদ্যালয়ে Cell Biology এর কোর্স করাতেন। তার লেকচারে কোষের জটিল গঠন নিয়ে বলতে গিয়ে “intelligent design” এর সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেছিলেন মাত্র। পাবলিকলি নিজ মত প্রকাশ করায় তিন বছর কন্ট্রাক্ট থাকা সত্ত্বেও আর্থিক অযুহাত দেখিয়ে Dr. Caroline Crocker কে চাকরি থেকে বহিষ্কার করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কন্ট্রাক্ট শেষ হয়ে যাবার দাবি করা হয়। পরবর্তীতে তিনি আবিষ্কার করেন, চাকরির ক্ষেত্রে তিনি রীতিমত ব্ল্যাকলিস্টেড হয়ে গিয়েছেন। সর্বশেষ প্রকাশিত Free To Think বইয়ে তিনি ব্যাপারগুলো বর্ণনা করেছেন। (২)
.
ইভোলুশনিস্টদের গোঁয়ার্তুমি নিজেদের দিকেই ব্যাকফায়ার করার দৃষ্টান্তও রয়েছে। ২০০৮ সালে Professor Michael Reiss শিক্ষার্থীদের Creationism সম্পর্কেও পড়াবার মত প্রকাশ করার পরের সপ্তাহেই ব্রিটেনের Royal Society থেকে পদত্যাগ করেন। মজার ব্যাপার হল, Professor Reiss নিজেও একজন ডারউইনিস্ট। তিনি Creationism নিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্রমাগত প্রশ্নগুলো ধামা চাপা না দিয়ে এটাও আরেকটা ওয়ার্ল্ড ভিউ হিসেবে আর ভুল – অন্তত এমনটা বলবার কথা বলেছিলেন। আর তাতেই কিনা তাকে Royal Society থেকে পদত্যাগ করতে হয়। (৩)
.
বায়োলোজিস্ট, নিউরোসায়েন্টিস্ট, জোতির্বিদ, পদার্থবিজ্ঞানী যারাই নিজেদের গবেষণাক্ষেত্রে বিভিন্ন বিষয়াদির Cause হিসাবে Intelligent Design এর সম্ভাবনার কথা বলেছেন তাঁরাই নিগৃহীত হয়েছেন। Ben Stein পরিচালিত Expelled: No Intelligence Allowed নামক ডকুমেন্টারিতে Intelligent Design এর প্রস্তাবক অনেকের উপর নির্যাতনের বিবরণ ফুটে উঠেছে। (৪) বলাই বাহুল্য, নাস্তিকদের এই ডকুমেন্টারি পছন্দ হয় নাই। অথচ ডকুমেন্টারির ইতি টানা হয়েছিল বিজ্ঞানী ও গবেষকদের নিজস্ব ধারণা কোনোরকম জুলুম ছাড়া প্রকাশ করবার দাবি জানিয়ে। ঠিক যেমনটা Galileo affair এর পর চাওয়া হয়েছিল।
.
Conflict Thesis এর বর্তমান আলোচিত বিষয়গুলো Evolution vs Intelligent Design যা প্রাণসৃষ্টির ব্যাপারে দুই ওয়ার্ল্ড ভিউয়ের সংঘর্ষকে আলোকপাত করে। আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, Multiverse vs Intelligent Design যা মহাবিশ্ব সৃষ্টির ব্যাপারে দুই ওয়ার্ল্ড ভিউয়ের সংঘর্ষকে আলোকপাত করে। আজগুবি ইভোল্যুশন না বলে যেসব গবেষক ও বিজ্ঞানীরা ‘বুদ্ধিমান সত্ত্বা’ বলছেন তাদের উপরই বর্তমান সায়েন্স কমিউনিটিগুলোর নির্যাতনের ব্যাপারটি যেন ক্যাথলিক চার্চের সেই নির্যাতনের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। অবশ্য নাস্তিক্যবাদী মহল নির্যাতন করবে নাই বা কেন… এখন Intelligent Design ই প্রমাণ হয়ে যাওয়া মানে তো সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বই প্রমাণ হয়ে যাওয়া। তখন তো আর বস্তুবাদী নাস্তিকতা চলবে না!
.
[৬]

ক্যাথলিক যুগে ব্রুনো গ্যালেলিওর উপর নির্যাতনের ঘটনা থেকে ঢালাওভাবে ‘সকল ধর্মই একইরকম’ উপসংহারে চলে আসা সত্যিই হাস্যকর। “Conflict Thesis” বা বিজ্ঞান আর ধর্মের দ্বন্দ্ব কিন্তু মূলত ধর্মগ্রন্থে ভুল থাকাকে রেফার করে। আর কুরআনে অনেক আগেই ঘোষণা করা হয়েছিল যে খ্রিস্টানরা তাদের কিতাব বিকৃতি করেছে। সুতরাং, ওদের কিতাবে ভুল থাকা তো আশ্চর্যের কিছু নয়। তাই বর্তমানের প্রতিষ্ঠিত সত্যের সাথে সহজেই ভুল থাকা বাতিল ধর্মগ্রন্থগুলোর অমিল থাকা খুব স্বাভাবিক। কিন্তু সমস্যাটা শুরু হয় যখন কুরআনকেও ওই ধর্মগ্রন্থগুলোর সাথে একই কাতারে আনা হয়।
.
সর্বশেষ আসমানি কিতাব কুরআনে কোনো ভুল নেই। এছাড়াও ১৪০০ বছরের আগের কুরআনের সাথে কোনোকিছু সংযোজন-বিয়োজন হয় নি। ড. মরিস বুকাইলির বিখ্যাত ঘটনা আরেকবার আলোচনা নিষ্প্রয়োজন। Conflict Thesis থেকে আরেকটি যে উপসংহার টানা হয়, তা হল ধর্মগ্রন্থগুলো মুক্তচিন্তার পথে বাধা দেয়। সেটাও খ্রিস্টানদের ক্যাথলিক নির্যাতনের রেফারেন্স থেকে জেনারালাইজ করে বলা হয়। ইসলামী বিশ্বে এমন একটি উদাহরণও তারা দেখাতে পারে না। বরং ইমাম আবু হানিফা (রহ), ইমাম আহমাদ (রহ) দের শত নির্যাতনেও নিজেদের অবস্থানে, ঈমানে অটল থাকবার ঘটনা কৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয়।
.
আল্লাহ রব্বুল আলামীন কুরআনকে ‘চিন্তাশীলদের জন্য নিদর্শন’ করেছেন। কিন্তু একইসাথে এই নাস্তিক্য যুগে আমরা মুসলিমরা যেটা ভুলে যাই তা হল কুরআন মূলত সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর পক্ষ থেকে ‘পথনির্দেশক’। তাই ইসলামী স্বর্ণযুগেও ক্যাথলিক চার্চের মত নির্যাতনের খবর পাওয়া যায় না। কারণ মুসলিমরা কুরআনে সময়ে সময়ে মু’জিযা দেখলেও জীবন গঠনেই ফোকাস করতো। মু’জিযার খোঁজে পড়ে রইতো না। আর মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর ﷺ শিক্ষাও এই।
.
বিজ্ঞান পরিবর্তনশীল। ‘আধুনিক বিজ্ঞানের বিরুদ্ধে যায়’ এমন আয়াত-হাদিস দেখলে আমরা সবর করি এবং আমরা জানি যে বরং বিজ্ঞানই ভুল বলছে। যেমন, ১৯৩০ এর আগে পৃথিবী জানতো না যে মহাবিশ্ব সম্প্রসারণশীল। বিজ্ঞান তখন মনে করতো মহাবিশ্ব স্থির। ব্যাপারটি তখন কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক ছিল। সেসময়ের কোনো বিজ্ঞান অনুরাগীকে জিজ্ঞেস করলে হয়তো বলতো যে কুরআন ভুল বলছে। কিন্তু কুরআন পরিবর্তন হয় নাই। এখন বিজ্ঞান নিজের পূর্বের মত বাদ দিয়ে কুরআনের বক্তব্যেই এসে থেমেছে। তাই মুসলিমদের আধুনিক বিজ্ঞান নিয়ে দুশ্চিন্তার কখনো কিছু ছিল না বিজ্ঞানের পরিবর্তনশীল প্রকৃতির কারণেই। কিন্তু মানবীয় ছোঁয়া পাওয়া অন্যান্য ধর্মগ্রন্থের কথা ভিন্ন।
.
তবে ‘জ্ঞান পরিবর্তনশীল আর ভবিষ্যতে অধিকতর সঠিকটা জানা যাবে’ বিজ্ঞান সম্পর্কে এমন ধারণা রেখে বিজ্ঞানকেই সুপিরিয়র মনে করা কিছু মানুষ রয়েছে। এমন দর্শন উপজীব্য করে বেঁচে থাকা অবিশ্বাসীদের বলি, আমরাও কিন্তু একই কথাই বলে যাই সবসময় –

“না, সত্ত্বরই তারা জানতে পারবে। অতঃপর না, সত্বর তারা জানতে পারবে।” (সূরা নাবা, ৪-৫)

রেফারেন্সঃ

(১) http://www.discovery.org/p/11

http://www.washingtonpost.com/wp-dyn/content/article/2005/08/18/AR2005081801680.html

http://www.discovery.org/a/2399.

http://www.richardsternberg.com/publications.php
.
(২) https://www.linkedin.com/in/drccrocker

https://creation.com/review-free-to-think-caroline-crocker

(৩) http://www.independent.co.uk/news/science/creationist-row-forces-scientist-to-quit-royal-society-post-933031.html
http://news.bbc.co.uk/2/hi/uk_news/education/7619670.stm
.
(৪) https://www.youtube.com/watch?v=V5EPymcWp-g

সংবাদটি শেয়ার করুন:
Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Email this to someonePrint this page

সর্বশেষ সংবাদ

Developed by: