মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ১০ আশ্বিন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ |
শিরোনাম
সিম রেজিস্ট্রেশনে আর কাগজ-কলম লাগবে না  » «   টাইফুন ‘জেবি’র আঘাতে লণ্ডভণ্ড জাপান, নিহত ৯  » «   রোনালদোর বেতন তিন গুণ বেশি!  » «   দ্বিতীয়বার সিলেটের মেয়র হিসেবে শপথ নিলেন আরিফ  » «   যে নামগুলো পাসওয়ার্ড হিসেবে ব্যবহার করবেন না  » «   ট্রাম্পের ‘প্যান্ট’ খুলে দিল যে বই  » «   নিরাপদ সড়ক আন্দোলন: ঘটনাই ঘটেনি, মামলা করে রেখেছে পুলিশ  » «   ‘অ্যাওয়ে গোল’ বাতিল করো, দাবি মরিনহো-ওয়েঙ্গারদের  » «   শহিদুলকে প্রথম শ্রেণির বন্দীর সুবিধা দিতে নির্দেশ  » «   আরপিও সংশোধন নিয়ে নির্বিকার নির্বাচন কমিশন  » «   মাহাথিরের রসিকতায় শ্রোতাদের মধ্যে হাসির রোল!  » «   দেশের বাইরে রান করাটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখি : মুশফিক  » «   দুর্দান্ত জয়ে সিপিএলের শীর্ষে মাহমুদুল্লাহরা  » «   খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবিতে বিএনপির ২ দিনের কর্মসূচি  » «   আদালতকে খালেদা জিয়া : ‘আমার অবস্থা খুবই খারাপ’  » «  

ফলো দা মানি! (দ্বিতীয় পর্ব)

আসিফ আদনান

ব্রেন্ডার বয়স যখন পাঁচ বছর তখন থেকে ডঃ মানি তার বক্তব্য, গবেষণা ও বইতে চাঞ্চল্যকর এ কেইসের কথা প্রকাশ করা শুরু করলেন। তবে সংগত কারণেই রাইমারদের পরিচয় প্রকাশ করলেন না। প্রায় রাতারাতি ব্রুস/ব্রেন্ডার কেইসের খবর চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লো। জন মানি প্রচার করা শুরু করলেন – নারী বা পুরুষ হওয়া মানুষের সত্ত্বাগত কোন বৈশিষ্ট্য না। পরিবেশ, প্রেক্ষাপটের দ্বারা একজন মানুষ নারী বা পুরুষ হতে শেখে। আর এর অকাট্য প্রমাণ হল দুই যমজ ভাইয়ের মধ্যে একজন ছেলে হিসেবে এবং অন্যজন সুস্থ সবল মেয়ে হিসেবে বড় হয়ে উঠছে।
ব্রুস/ব্রেন্ডার কেইস ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। সাইকোলজি, সেক্সোলজি, জেন্ডার স্টাডি ইত্যাদি ডিসিপ্লিনের পাঠ্যবইয়ে এ কেইসের কথা যুক্ত করা হয়। এ কেইস ছিল মানবিক যৌনতা, লিঙ্গ ও মনস্তত্ত্বের ব্যাপারে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচক। এক মাইলফলক। প্রকৃতি বনাম প্রশিক্ষণের (Nature vs Nurture) যুদ্ধে প্রশিক্ষণের বিজয়ের অবিসম্বাদিত প্রমাণ ছিল ব্রুসের সফলভাবে ব্রেন্ডায় পরিণত হওয়া। এ উপসংহার বিভিন্ন জনের কাছে বিভিন্ন কারণে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মানির জন্য এটা ছিল শিশু যৌনতা, লিঙ্গ ও যৌনতার মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে তার প্রিয় থিওরির প্রমাণ। সমকামী এবং অন্যান্য বিকৃত যৌনাচারে অভ্যস্ত ব্যক্তিদের জন্য এ কেইস এবং এর উপসংহার গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ পরিবেশ ও প্রেক্ষাপটের কারণে যদি একজন ছেলে একজন মেয়েতে পরিণত হতে পারে, তাহলে একজন পুরুষ বা নারীর সমলিঙ্গের প্রতি আকর্ষণকে কেন অস্বাভাবিক, বিকৃত বা অসুস্থতা মনে করা হবে? খোদ নারী বা পুরুষ পরিচয়ই যদি পূর্ব-নির্ধারিত না হয়, অপরিবর্তনীয় না হয়, বরং অর্জিত (learned/acquired) হয়, তাহলে কীভাবে যৌনতা পূর্ব নির্ধারিত হতে পারে?
অন্যদিকে ফেমিনিস্টদের জন্য এ কেইস গুরুত্বপূর্ণ ছিল কারণ তারা দীর্ঘদিন ধরে দাবি করছিল নারী ও পুরুষের মধ্য মৌলিক কোন পার্থক্য নেই। ছেলেরা যা পারে, মেয়েরাও তাই পারে। ছেলেরা যতোটুকু পারে ততোটুকুই পারে। তাই কিছু কাজে, যেমন ম্যাথম্যাটিকস বা শিল্পে (art), ছেলেরা মেয়েদের চেয়ে দক্ষ – এ কথার কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। পুরুষ ম্যাথম্যাটিশিয়ানদের সমান সংখ্যক নারী ম্যাথম্যাটিশিয়ান দেখা যায় না, কিংবা নারীদের মধ্যে কোন বেইতোভেন, মোৎযার্ট কিংবা মাইকেলেঞ্জেলোকে পাওয়া যায় না – এটা জাস্ট শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা পুরুষতন্ত্রের প্রভাব।
১৯৭৩ এর জানুয়ারি সংখ্যায় টাইম ম্যাগাযিন মন্তব্য করে – “চাঞ্চল্যকর এই কেইস নারীবাদীদের বক্তব্যের পক্ষে জোরালো সমর্থন দেয়।”
ডেইভিডঃ
কিন্তু মিডিয়ার রঙ্গিন আর অ্যাকাডেমিকদের এলিগ্যান্ট তত্ত্বের জগত থেকে দূরে উইনিপেগের ছবিটা ছিল অন্যরকম। একবারে শুরু থেকেই রাইমাররা অনুভব করতে পারছিলেন কোন একটা জায়গায় হিসেবে মিলছে না। কোথাও কোন একটা সমস্যা রয়ে যাচ্ছে। যদিও ওরা দু’জন এটা স্বীকার করতে চাচ্ছিলো না। একেবারে ছোটবেলা থেকেই ‘ব্রেন্ডা’র আচরণে মেয়েলিপনার কোন ছাপ ছিল না। ওর প্রিয় কাজ ছিল দৌড়ানো, ব্রায়ানের গাড়ি নিয়ে খেলা করা আর ছেলেদের সাথে পুরো দমে মারপিট করা। পুতুল খেলা ছিল দু চোখের বিষ। স্কুলে ও ছিল একা। রাগী, একগুঁয়ে। মেয়েদের সাথে খেলতে চাইতো না। ছেলেরা ওকে খেলায় নিতো না। এমনকি বাসাতেও খেলার সময় ও নেতৃত্ব দিতো। ব্রায়ান ওর অনুসরণ করতো। ওর হাটা, চলা, কথা সবকিছুতে ব্রুসকে দেখতে পাওয়া যেতো, ব্রেন্ডাকে না।
বয়স বাড়ার সাথে সাথে সমস্যাগুলো বাড়তে থাকে। বাড়তে থাকে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, রাগ, কষ্ট। ও বুঝতে পারছিল ও অপরিচিত, অদ্ভুত। ও খাপ খায় না। এসব কিছুর প্রভাব পড়ছিল ওর পড়াশোনায়। প্রথমে গোপন রাখতে চাইলেও স্কুলে ক্রমাগত খারাপ পারফরমেন্সের পর শিক্ষকদের নানা ধরণের প্রশ্নের জবাবে রাইমাররা ওর অতীত সম্পর্কে জানাতে বাধ্য হয়। স্কুল থেকেই ওর জন্য সাইকলোজিস্ট ঠিক করে দেওয়া হয়। কিন্তু একের পর এক সাইকলোজিস্ট এ সিদ্ধান্তেই পৌছাতে বাধ্য হন, যদিও ব্রুস হওয়ার কোন স্মৃতি ওর নেই তবুও ‘ব্রেন্ডা’ কোন এক কারণে – তার রূপান্তরকে মেনে নিচ্ছে না। একের পর এক সাইকলোজিস্ট এবং জ্যানেট তার নিয়মিত চিঠিতে মানিকে ব্যাপারগুলো জানান। কিন্তু বরাবরই ডঃ মানি বিষয়টিকে “টমবয়ের স্বাভাবিক দস্যিপনা” বলে উড়িয়ে দেন।
তবে এক পর্যায়ে ডঃ মানিও বাধ্য হন ব্যাপারটিকে গুরুত্ব দিতে। কারণ তার পূর্নাঙ্গ থিওরিকে প্রমাণ করার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় ক্রমেই এগিয়ে আসছিলো। মানির থিওরি অনুযায়ী ব্রেন্ডার রূপান্তরকে সম্পূর্ণ করতে কৈশোরের আগেই সার্জারি মাধ্যমে ওর শরীরে যোনি স্থাপন করা আবশ্যক। এটাই হল রূপান্তরের ফাইনাল স্টেপ। কিন্তু ব্রেন্ডাকে কোন ভাবেই সার্জারির জন্য রাজি করানো যাচ্ছিলো না। সার্জারি কথা শুনতেই ও রাজি না। ডঃ মানি বিভিন্ন ভাবে ব্রেন্ডাকে বোঝানোর চেষ্টা করেন। নিজ অফিসের নির্জন রুমে তিনি ব্রেন্ডাকে ছবি দেখান। নারী ও পুরুষের নগ্ন ছবি। যৌনাঙ্গের ছবি। মিলন রত ছবি। প্রসবের ছবি। মানির যুক্তি ছিল, নারীত্ব ও যোনির গুরুত্ব বোঝানোর জন্য ব্রেন্ডাকে মানব যৌনতা সম্পর্কে ধারণা দেওয়া ছিল আবশ্যক। যেহেতু মানি বিশ্বাস করতেন জন্ম থেকেই মানবশিশুর মধ্য যৌনতার অনুভূতি থাকে তাই এতে কোন বিপদের আশঙ্কাও ছিল না। ডঃ মানি জ্যানেট এবং রনাল্ডকে বাসায় বাচ্চাদের সামনে, বিশেষ করে ব্রেন্ডার সামনে সঙ্গম করার পরামর্শ দেন, যাতে করে যৌনতা সম্পর্কে ওদের ধারণা আরো পরিষ্কার হয়। ওরা অস্বীকৃতি জানালে, মানি পরামর্শ দেন জ্যানেট যেন অ্যাটলিস্ট গৃহস্থালির কাজ করার সময় নগ্ন থাকে। যাতে করে নারী পুরুষের পার্থক্য এবং নিজের নারীত্ব সম্পর্কে ব্রেন্ডার বিশ্বাস আরো গাঢ় হয়।[1] বিশ্ববিখ্যাত ডঃ-এর এই প্রেসক্রিপশান রাইমাররা মেনে চলার চেষ্টা করে। পুরো ব্যাপারটা ব্রেন্ডাকে আরো বিভ্রান্ত, আরো দিশেহারা করে তোলে। ব্রেন্ডার বয়স ছিল ৭ বছর।
ব্রেন্ডার “ট্রিটমেন্ট” চলতে থাকে। কিন্তু সময়ের সাথে সবার কাছে পরিষ্কার হতে থাকে ও আর দশটা মেয়ের মতো। বরং ব্রেন্ডার কোন কিছুই মেয়ের মতো না। ব্রেন্ডার বয়স বারো হলে ডঃ মানির পরামর্শে ওকে হরমোন ট্যাবলেট খেতে বাধ্য করা হয়। বন্ধুহীন, নিরাপত্তাহীন নিষ্ঠুর এক পরিবেশে ব্রেন্ডা বড় হতে থাকে। নিজের মেয়েলি পোশাক, নিজের অস্বাভাবিকতা, ভাঙ্গতে থাকা কণ্ঠস্বর, নিজের শারীরিক অসম্পূর্ণতা, সার্জারির জন্য বাবা-মার চাপাচাপি, একের পর একে সাইকলোজিস্টের সাথে সেশন, বাল্টিমোরের নির্জন রুমের অন্ধকার স্মৃতি, নিজের একাকীত্ব, হঠাৎ ড মানির কথা মতো ওর উপর জোর করে সার্জারি করা হবে – সব কিছু মিলিয়ে ক্রমেই গভীর হতে থাকা রাগ আর হতাশার এক ঘূর্ণিপাকে ব্রেন্ডাকে নিজেকে আবিষ্কার করে। ওর মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা দেয়। শেষ পর্যন্ত লোকাল সাইকলোজিস্টের পরামর্শে, ডঃ জন মানির অমতে রনাল্ড আর জ্যানেট সিদ্ধান্ত নেয় ব্রেন্ডাকে ওর অতীত সম্পর্কে জানাবার।
১৯৮০-র মার্চের এক পড়ন্ত দুপুরে সাইকলোজিস্টের সাথে সাপ্তাহিক সেশনের পর রনাল্ড সব কিছু ব্রেন্ডাকে খুলে বলে। গাল বেয়ে পড়া পানি আর হাতের গলতে থাকে কোন আইসক্রিমের ফোটা কোলে জমতে থাকে। ও নিজের ভেতর মুক্তির স্বাদ অনুভব করে। বোধশক্তি হবার পর থেকে বিভ্রান্তি আর ওর কাছে দুর্বোধ্য, অজানা এক বাস্তবতার যে বোঝা ওর ওপর চেপে ছিল, মনে হল শেষ পর্যন্ত তা তুলে নেয়া হয়েছে। রনের কথা শেষ হবার প্রায় সাথে সাথেই ব্রুস ওর সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয়। ও একজন ছেলে আর ও ছেলে হিসেবেই জীবন কাটাবে। অতীতের সব চিহ্ন মুছে ফেলার চেষ্টায় ও নিজের জন্য নতুন বেছে নেয়। ডেইভিড। বাইবেলের সেই ছেলেটার মতো যে বিশাল দানবকে যুদ্ধ হারিয়েছিল। ডেইভিড রাইমার।
ছোটকালে হওয়া দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণ হিসেবে হসপিটাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে রাইমাররা কিছু টাকা পেয়েছিল। এ টাকা ডেইভিড সার্জারির জন্য খরচ করার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে জন মানির প্রস্তাবিত সার্জারি না। বরং তার উল্টো রেসাল্টের জন্য। এই ফ্যালোপ্ল্যাস্টি সার্জারিতে ডেইভিডের ডান কবজি থেকে মাংস, নার্ভ আর আর্টারি এবং ওর বাম বাম পাজড় থেকে কার্টিলেজ নিয়ে ওর শরীরে একটি কৃত্রিম লিঙ্গ স্থাপন করার চেষ্টা করা হবে। বারো ধাপের এ সার্জারি শেষ করতে তিন জন সার্জেনের ১৩ ঘণ্টা সময় লাগে। সার্জারি সফল হয়। সেপ্টেম্বর ২২, ১৯৯০ এ ডেইভিড রাইমার জেইন ফন্টেইনকে বিয়ে করে।
গল্পটা এখানে শেষ হলে ভালো হতো। ডেইভিড সুখে-শান্তিতে তার বাকি জীবন কাঁটিয়ে দিল। ক্ষতবিক্ষত, ভ্রমণ ক্লান্ত, কিন্তু সন্তুষ্ট একজন মানুষ হিসেবে – এমন উপসংহার হয়তো সবার জন্যই ভালো হত। কিন্তু বাল্টিমোরে জন মানির সাথে নির্জন সেশনগুলোতে এমন কিছু হয়েছিল যার বীজ ও আর ব্রায়ান ভেতরে বয়ে বেড়াচ্ছিল। এমন এক অন্ধকারে উঁকি দিতে ওরা বাধ্য হয়েছিল, আমৃত্যু যা ওদের তারা করে বেড়াবে। শত চেষ্টার পরও যে অন্ধকারের কবল থেকে ওরা মুক্ত হতে পারেন।
খুব কম বয়সে ব্রায়ান মদ ধরে। সপ্তাহান্তে ফুর্তির জন্য মদ খাওয়া না। দুনিয়ার উপর জেদ নিয়ে, নিজের সাথে নিজে পাল্লা দিয়ে, দিনের পর দিন কখনো পুরোপুরি মাতাল না থাকার মতো করে মদ খাওয়া। ওর মাথার ভেতর, ওর মনে ভেতর কিছু একটা ওকে কুরে কুরে খাচ্ছিলো। সবসময় অনুতপ্ত, আর ডেইভিডকে নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত রণ আর জ্যানেটের হয়তো ব্যাপারটা খেয়াল করার মতো অবস্থা ছিল না, তবে সমস্যাটা সামনে আসতে শুরু করে যখন ডেইভিডের অতীতের ব্যাপারে সত্য দু ভাইকে জানানোর পর।
পুরো ঘটনায় সবার মনোযোগ ছিল ডেইভিডের উপর। সংগত কারণেই। ব্রায়ান ব্যাপারটা কীভাব হ্যান্ডেল করছে সেই দিকে মনোযোগ দেয়ার সুযোগ তেমন ছিল না। তাই যখন কিছুদিন পর ব্রায়ানের নার্ভাস ব্রেক ডাউনের মতো হল, তখন সেটা অপ্রত্যাশিত ছিল। দীর্ঘদিন ধরে একের পর এক দুর্ঘটনা আর বিপর্যয়ের মোকাবেলা করতে করতে অনেকটাই অবশ হয় আসা রাইমার পরিবার তাদের লম্বা দুর্ভাগ্যের লিস্টের আরেকটি দুর্ভাগ্য হিসেবে একে দেখে। কিন্তু সমস্যা বাড়তে থাকে। ব্রায়ানের মানসিক সমস্যাকে রাইমাররা সিরিয়াসলি নিতে বাধ্য হয় যখন ডেইভিডের সার্জারির দু সপ্তাহ আগে ব্রায়ান প্রথমবারের মতো আত্মহত্যার চেষ্টা করে। কদিন পরই ছিল দু’জনের ষোলতম জন্মদিন। কিছুদিন পর ব্রায়ান পড়াশুনা বন্ধ করে দেয়। এক পেট্রোল পাম্পে চাকরি নেয়। বাসা থেকে বের হয়ে গার্ল ফ্রেন্ডকে সাথে নিয়ে আলাদা থাকা শুরু করে। প্রথমবার বিয়ে করে ১৯ বছর বয়সে। কিন্তু দু সন্তানের জন্মের পরও বিয়েটা টেকে না। কয়েক বছরের মধ্যে ডিভোর্স হয়ে যায়।
নেশাতুর কয়েক বছর কাটাবার পর আবার বিয়ে করে ব্রায়ান। কিন্তু আবারো একই পরিণতি।
ভেতরের অস্থিরতা ওর জীবনকেও অস্থির করে তুলছিল। কিছু একটাকে ভুলে থাকতে, চাপা দিতে চাইছিল ও। নিজের কাছ থেকে নিজে পালিয়ে বেড়ানোর চেষ্টায় মদ আর ঘুমের ওষুধের নেশার গাড়, অবশ অনুভূতির চাদরে মনকে, চিন্তাকে ঢেকে রাখছিল। ঠিক কী থেকে ব্রায়ান পালাতে চাইছিল রন আর জ্যানেট বুঝতে পারছিল না। ওদের বোঝার উপায়ও ছিল না। পৃথিবীতে কেবল একজনই জানতো জাগ্রত মুহূর্তগুলোতে কোন স্মৃতি থেকে ব্রায়ান পালিয়ে বেড়াতো, আর অচেতন অবস্থায় কোন স্মৃতি দুঃস্বপ্ন হয়ে ওর সামনে হাজির হতো। কিন্তু ডেইভিড সংকল্প করেছিল ভুলে থাকার।
ডেইভিড আর ব্রায়ানের শৈশব কোন অর্থেই সহজ ছিল না। খুব অল্প বয়স থেকেই ডেইভিডকে তীব্র কষ্ট, হতাশা, প্রতিকূলতা আর ভয়ের মুখোমুখি হতে হয়েছে। একই মাত্রায় না হলেও একই কথা ব্রায়ানের ক্ষেত্রেও খাটে। কিন্তু সব কিছু ছাপিয়ে ডেইভিড এবং ব্রায়ানের সবচেয়ে অপছন্দের, সবচেয়ে ভয়ের স্মৃতি ছিল বাল্টিমোরের দিনগুলো। ডঃ মানির অফিসে কাটানো নির্জন সময়গুলোর দু ভাইয়ের মনে কী গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল তার একটা ধারণা পাওয়া যায় ডেইভিডের এক দুর্লভ স্বীকোরোক্তি থেকে। ডেইভিড আর জেইন ডকুমেন্টারি দেখছিল। সিআইএ- এর টর্চার নিয়ে বানানো ডকুমেন্টারিতে দেখানো হচ্ছিল কীভাবে বন্দীদের যৌনাঙ্গে ইলেকট্রিক শক দিয়ে অত্যাচার চালানো হয়। হঠাৎ জেইন আবিষ্কার করলো ডেইভিড চিৎকার করে কাঁদছে। প্রলাপ বকছে। ভিডিওর ঐ দৃশ্য ওকে ভয়ঙ্কর কোন স্মৃতির কথা মনে করিয়ে দিয়েছিল। কান্নার দমকে এলোমেলো হয়ে যাওয়া কথাগুলো বুঝতে না পারলেও জেইন একটা নাম চিনতে পারছিল। জন মানি।
রাইমাররা বছরে একবার বাল্টিমোরে যেতো, রেগুলার চেকআপের অংশ হিসেবে। প্রথমে ওরা চারজন ডঃ মানির অফিসে বসতো। রন আর জ্যানেটের সাথে কিছুক্ষণ কথা বলার পর ডঃ মানি ব্রায়ান আর ব্রুসকে আলাদা রুমে নিয়ে যেতেন। প্রাইভেট সেশনের জন্য। একজন নারী হিসেবে স্বাভাবিক “বিকাশের” জন্য ব্রুস/ব্রেন্ডাকে নগ্নতা ও যৌনতার মুখোমুখি দাড় করিয়ে দেয়া ডঃ মানির মতে অপরিহার্য ছিল। “স্বাভাবিক বিকাশের” অংশ তিনি ব্রুস আর ব্রায়ানকে পর্ণোগ্রাফি আর স্টিল ইমেজ দেখান। যখন ওদের বয়স ৭, এক সেশনে ডঃ মানি ওদের দু জনকে কাপড় খুলে নগ্ন হবার নির্দেশ দেন। ৭ বছরের নগ্ন ব্রুসকে জন মানি হামাগুড়ি দেয়ার ভঙ্গিতে মেঝেতে চার হাত-পায়ে ভর দিতে বাধ্য করেন। মানি তারপর নগ্ন ব্রায়ানকে বলেন ব্রুসের পেছনে গিয়ে দাঁড়াতে। আবার কোন কোন সেশনে মানি ব্রুসকে বলেন দু পা ছড়িয়ে করে চিত হয়ে শুতে। আর তারপর ব্রায়ানকে বাধ্য করেন ব্রুসের উপড়ে উঠতে। ছোট্ট এ যমজ শিশু দুটিকে জন মানি সেক্সুয়াল রোল-প্লে তে বাধ্য করেন।[2] এ অবস্থায় জন মানি ওদের ছবি তোলেন। তিনি ওদের এমন এক দুর্বিষহ অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যেতে বাধ্য করেন যা সারা জীবনের জন্য ওদেরকে ক্ষতবিক্ষত করে দেয়। আর সব কিছুকে ছাপিয়ে এই “থেরাপি” সেশন দুই যমজের উপর সবচেয়ে গভীর প্রভাব ফেলে।
জীবনভর শত চেষ্টার পরও ওরা এ ভয়ঙ্কর স্মৃতি মুছে ফেলতে ব্যর্থ হয়। যখন ডেইভিড শেষ পর্যন্ত তার অতীত সম্পর্কে জানতে পারে তখন আর সব কিছু পেছনে ফেলে আসতে পারলেও এই বিকৃত যৌন নির্যাতনকে স্মৃতি থেকে মুছে ফেলা ওর আর ব্রায়ানের জন্য সম্ভব ছিল না। ১৩ বছর বয়সে যখন ব্রায়ান বুঝতে পারলো ওর বোন আসলে ওর ভাই, এবং জন মানি ওদেরকে দিয়ে যা করিয়েছিলেন তা অজাচার এবং সমকামের অনুকরণ – তখন পুরো ব্যাপারটা কীভাবে ওর মনের উপর ঠিক কী রকম প্রভাব ফেলেছিল? এ ধরণের স্মৃতি একজন মানুষকে দুমড়ে মুচড়ে, ভেঙ্গে চুড়ে দিতে বাধ্য।
ব্রায়ান চেষ্টা করেছিল। কিন্তু এ স্মৃতি, এ অন্ধকারের কবল থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে ও ব্যর্থ হয়। ওর ডিপ্রেশন, মুড সুইংস, মদ আর ঘুমের ওষুধের নেশা তীব্র হতে থাকে। ২০০২ এর বসন্তে ৩৬ বছর বয়সে ব্রায়ান আত্মহত্যা করে। ব্রায়ানের মৃত্যু ডেইভিডের উপর গভীর প্রভাব ফেলে। বিভিন্ন কারণে ওর আর্থিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। ডেইভিড নিজেও ডিপ্রেশনের চোরাবালিতে তলিয়ে যেতে শুরু করে। ব্রায়ানের মৃত্যুর প্রায় দু’ বছর পর, মে-র এক দুপুরে জেইন ওকে জানায় কিছু দিনের জন্য ও আলাদা থাকতে চাচ্ছে। যদিও জেইন আশ্বস্ত করে বলে ও ডিভোর্সের কথা ভাবছে না, ডেইভিড সবচেয়ে খারাপ পরিণতিকেই অবধারিত বলে ধরে নেয়। ও নিজেকে ব্যর্থ মনে করছিল। স্বামী হিসেবে, পুরুষ হিসেবে। সেদিন রাতে ডেইভিড ঘর ছেড়ে বের হয়ে যায়। কোন অঘটনের আশংকায় জেইন থানায় রিপোর্ট করে। পরদিন পুলিশ জানায় ডেইভিড সুস্থ আছে, বেঁচে আছে। তবে কোথায় আছে সেটা ও জেইনকে জানাতে চায় না। বিপদ এড়ানো গেছে ভেবে জেইন সেদিনকার মতো অফিসে যায়। ও বেড়িয়ে গেলে ডেইভিড বাসায় আসে। খুঁজে বের করে গ্যারজে নিয়ে ধীর স্থির ভাবে ওর শটগানের ব্যারেল চেঁছে নেয়। তারপর গাড়ি নিয়ে বেড়িয়ে যায়।
২০০৪ সালের ৪ই মে ওর বাসার কাছে এক সুপারস্টোরের পার্কিং লটে ডেইভিডের বিস্ফোরিত খুলির মৃতদেহ পাওয়া যায়। ওর বয়স ছিল ৩৮ বছর।
জন মানি মারা যান ২০০৬ সালে, ৮৫ বছর বয়সে, পার্কিন্সন্সে ভুগে। বিশ্বখ্যাত, নন্দিত অ্যাকাডেমিক, মনস্তত্ত্ব ও যৌনতার গবেষণায় নব দিগন্তের সূচনাকারী পথিকৃৎ হিসেবে। মানির অনেক থিওরি মানবিক যৌনতা সংক্রান্ত পাঠ্যপুস্তকের প্রমাণিত সত্য হিসেবে গৃহীত হয়। Gender Role, Gender Identity এবং Gender Fluidity –এর মতো অনেক ধারণা ও পরিভাষা সরাসরি ডঃ মানির কাছ থেকে নেওয়া। .
ডেইভিড রাইমারের জীবনের প্রথম দিকে ডঃ মানি ব্যাপকভাবে কেইসটিকে তার থিওরির স্বপক্ষে অকাট্য প্রমাণ হিসেবে প্রচার করেন। তিনি বলেন ডেইভিডের ঘটনা প্রমাণ করে মানুষের লৈঙ্গিক পরিচয় পরিবেশ ও প্রশিক্ষণ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, প্রকৃতির মাধ্যমে না। মানি ডেইভিডের কেইসকে অমিশ্র সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেন। এ কেইসকে মডেল হিসেবে উপস্থাপন করে জনস হপকিন্সে এরকম আরো অনেক সার্জারি ও “ট্রিটমেন্ট” করা হয়। পুরো ব্যাপারটা যে রাইমার পরিবারের জন্য এক মহা বিপর্যয় ছিল, মানির লেখা থেকে বোঝার উপায় ছিল না। মানি এক সুখী পরিবারের ছবি এঁকেছিলেন যেখানে হাসিখুশি বাবা-মা পরম যত্নে তাদের দুই সুস্থ-স্বাভাবিক সন্তানকে বড় করছে। আর লিঙ্গ পরিবর্তন সার্জারি মাধ্যমে যাওয়া শিশুটি সবদিক দিয়ে একজন স্বাভাবিক মেয়ে হিসেবে বেড়ে উঠছে।
অথচ বাস্তবতা ছিল পুরোপুরি ভিন্ন। যখন ১৩ বছর বয়সে ডেইভিড একজন পুরুষ হিসেবে জীবন কাটানোর সিদ্ধান্ত নেয়, ডঃ মানিকে ব্যাপারটা জানাও হয়। কিন্তু মানি তার প্রকাশিত বই, জার্নাল, আর্টিকেল, বক্তব্য – সব জায়গাতেই এ গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি উল্লেখ করতে ভুলে যান। তবে ডেইভিডের কেইস সম্পর্কে কথা বলা কমিয়ে দেন। শেষ পর্যন্ত ১৯৯৭ সালে যখন ডেইভিডের কেইসের আসল অবস্থার কথা ব্যাপকভাবে প্রকাশিত হয়, মানি তার এক্সপেরিমেন্টের ব্যর্থতার জন্য মিডিয়া হট্টগোলকে দায়ী করেন। কখনো রক্ষণশীল মিডিয়ার ষড়যন্ত্রের কথা বলেন আবার কখনো রন আর জ্যানেটের অভিভাবক হিসেবে যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। যদিও এর আগে মানির নিজের মেডিকাল নোটসে দু’জনের ভূয়সী প্রশংসা করেছিল। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ডেইভিড রাইমারের জীবন ও মৃত্যুর ব্যাপারে জন মানির ভেতরে বিন্দুমাত্র অনুতাপ দেখা যায় নি।
তবে মানি স্বীকার না করলেও রাইমার যমজের দুঃখ ভারাক্রান্ত জীবন আর আত্মহত্যার পেছনে তার এক্সপেরিমেন্ট এবং বিশেষ করে তার থেরাপি সেশনগুলোর ভূমিকা কোন সুস্থ, সুবিবেচক মানুষ অস্বীকার করার কথা না। ক্রমাগত তীব্র যৌনতার উপস্থাপন, যৌন সঙ্গম অনুকরণে বাধ্য করা, এমন অবস্থায় ছবি তোলা, ক্রমাগত তার যৌনাঙ্গ এবং যৌন পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলা, সর্বোপরি একজন ছেলেকে জোর করে একজন মেয়েতে পরিণত করার চেষ্টা – এ বিষয়গুলো খুব সহজে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। যেকোনো প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ওপর এধরনের ঘটনার তীব্র ও গভীর নেতিবাচক প্রভাব পড়া স্বাভাবিক। আর ডেইভিড আর ব্রায়ানের সাথে এ ঘটনাগুলো ঘটেছিল শৈশব থেকে।
একজন বিখ্যাত, সম্মানিত সাইকলোজিস্ট কেন শিশুদের এধরনের আচরণে বাধ্য করবেন, পাঠকের মনে এমন প্রশ্নের উদয় হওয়া স্বাভাবিক। কোন মেডিকাল ডিগ্রি না থাকা একজন সাইকলোজিস্ট কীভাবে একের পর এক রোগীকে এতো বড় মাপের একটা সার্জারি করার পরামর্শ দিয়ে যেতে পারেন, সেটা নিয়েও প্রশ্ন জাগতে পারে।
ইনশা আল্লাহ্‌ সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে আগামী পর্বে…..

সংবাদটি শেয়ার করুন:
Share on Facebook
Facebook
0Share on Google+
Google+
0Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin
Email this to someone
email
Print this page
Print

সর্বশেষ সংবাদ

Developed by: