শনিবার, ২৩ জুন ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৯ আষাঢ় ১৪২৫ বঙ্গাব্দ |
শিরোনাম
বিশ্বকাপ ফুটবলঃ আইসল্যান্ড এর বিপক্ষে নাইজেরিয়ার দারুণ জয়  » «   বিশ্বকাপ ফুটবল ২০১৮: শেষ মূহুর্তের দুই গোলে চমক দেখালো ব্রাজিল  » «   বিশ্বকাপ ফুটবল ২০১৮ঃ আর্জেন্টিনাকে ৩ গোলে বিধ্বস্ত করে দ্বিতীয় রাউন্ডে ক্রোয়েশিয়া  » «   ওয়ার্ল্ড কাপ ২০১৮: নক আউট পর্বের আশা বাঁচিয়ে রাখলো স্পেন  » «   হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পর অস্ট্রেলিয়া-ডেনমার্ক ম্যাচ ড্র  » «   মেসি সর্বকালের সেরা: রাকিটিচ  » «   বিশ্বকাপ ফুটবল ২০১৮: রোনালদোর গোলে দ্বিতীয় রাউন্ডের পথে পর্তুগাল  » «   বিশ্বকাপ ফুটবল ২০১৮ঃ সৌদি আরবকে হারিয়ে দ্বিতীয় রাউন্ডে উরুগুয়ে  » «   কমলগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতি আরো ভয়াবহঃ তিনজনের লাশ উদ্ধার  » «   নগরীতে বন্ধুদের ছুরিকাঘাতে কিশোর খুন  » «   বাংলাদেশী নাজমা খানের আহ্বানে হিজাব পরছেন অন্য ধর্মাবলম্বীরাও  » «   কেমন আছেন সালাহ?  » «   সিলেট সিটি নির্বাচন ৩০ জুলাই  » «   তৃতীয়বার আইপিএল চ্যাম্পিয়ন চেন্নাই সুপার কিংস  » «   নগরীর অভিজাত শপ-রেস্টুরেন্টে ভ্রাম্যমাণ আদালতের জরিমানা  » «  

ফলো দা মানি! (শেষ পর্ব)

আসিফ আদনান

জন মানি মারা যান ২০০৬ সালে, ৮৫ বছর বয়সে, পার্কিন্সন্সে ভুগে। বিশ্বখ্যাত, নন্দিত অ্যাকাডেমিক, মনস্তত্ত্ব ও যৌনতার গবেষণায় নব দিগন্তের সূচনাকারী পথিকৃৎ হিসেবে। মানির অনেক থিওরি মানবিক যৌনতা সংক্রান্ত পাঠ্যপুস্তকের প্রমাণিত সত্য হিসেবে গৃহীত হয়। Gender Role, Gender Identity এবং Gender Fluidity –এর মতো অনেক ধারণা ও পরিভাষা সরাসরি ডঃ মানির কাছ থেকে নেওয়া।

ডেইভিড রাইমারের জীবনের প্রথম দিকে ডঃ মানি ব্যাপকভাবে কেইসটিকে তার থিওরির স্বপক্ষে অকাট্য প্রমাণ হিসেবে প্রচার করেন। তিনি বলেন ডেইভিডের ঘটনা প্রমাণ করে মানুষের লৈঙ্গিক পরিচয় পরিবেশ ও প্রশিক্ষণ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, প্রকৃতির মাধ্যমে না। মানি ডেইভিডের কেইসকে অমিশ্র সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেন। এ কেইসকে মডেল হিসেবে উপস্থাপন করে জনস হপকিন্সে এরকম আরো অনেক সার্জারি ও “ট্রিটমেন্ট” করা হয়। পুরো ব্যাপারটা যে রাইমার পরিবারের জন্য এক মহা বিপর্যয় ছিল, মানির লেখা থেকে বোঝার উপায় ছিল না। মানি এক সুখী পরিবারের ছবি এঁকেছিলেন যেখানে হাসিখুশি বাবা-মা পরম যত্নে তাদের দুই সুস্থ-স্বাভাবিক সন্তানকে বড় করছে। আর লিঙ্গ পরিবর্তন সার্জারি মাধ্যমে যাওয়া শিশুটি সবদিক দিয়ে একজন স্বাভাবিক মেয়ে হিসেবে বেড়ে উঠছে। অথচ বাস্তবতা ছিল পুরোপুরি ভিন্ন। যখন ১৩ বছর বয়সে ডেইভিড একজন পুরুষ হিসেবে জীবন কাটানোর সিদ্ধান্ত নেয়, ডঃ মানিকে ব্যাপারটা জানাও হয়। কিন্তু মানি তার প্রকাশিত বই, জার্নাল, আর্টিকেল, বক্তব্য – সব জায়গাতেই এ গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি উল্লেখ করতে ভুলে যান। তবে ডেইভিডের কেইস সম্পর্কে কথা বলা কমিয়ে দেন। শেষ পর্যন্ত ১৯৯৭ সালে যখন ডেইভিডের কেইসের আসল অবস্থার কথা ব্যাপকভাবে প্রকাশিত হয়, মানি তার এক্সপেরিমেন্টের ব্যর্থতার জন্য মিডিয়া হট্টগোলকে দায়ী করেন। কখনো রক্ষণশীল মিডিয়ার ষড়যন্ত্রের কথা বলেন আবার কখনো রন আর জ্যানেটের অভিভাবক হিসেবে যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। যদিও এর আগে মানির নিজের মেডিকাল নোটসে দু’জনের ভূয়সী প্রশংসা করেছিল। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ডেইভিড রাইমারের জীবন ও মৃত্যুর ব্যাপারে জন মানির ভেতরে বিন্দুমাত্র অনুতাপ দেখা যায় নি।

তবে মানি স্বীকার না করলেও রাইমার যমজের দুঃখ ভারাক্রান্ত জীবন আর আত্মহত্যার পেছনে তার এক্সপেরিমেন্ট এবং বিশেষ করে তার থেরাপি সেশনগুলোর ভূমিকা কোন সুস্থ, সুবিবেচক মানুষ অস্বীকার করার কথা না। ক্রমাগত তীব্র যৌনতার উপস্থাপন, যৌন সঙ্গম অনুকরণে বাধ্য করা, এমন অবস্থায় ছবি তোলা, ক্রমাগত তার যৌনাঙ্গ এবং যৌন পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলা, সর্বোপরি একজন ছেলেকে জোর করে একজন মেয়েতে পরিণত করার চেষ্টা – এ বিষয়গুলো খুব সহজে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। যেকোনো প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ওপর এধরনের ঘটনার তীব্র ও গভীর নেতিবাচক প্রভাব পড়া স্বাভাবিক। আর ডেইভিড আর ব্রায়ানের সাথে এ ঘটনাগুলো ঘটেছিল শৈশব থেকে।

একজন বিখ্যাত, সম্মানিত সাইকলোজিস্ট কেন শিশুদের এধরনের আচরণে বাধ্য করবেন, পাঠকের মনে এমন প্রশ্নের উদয় হওয়া স্বাভাবিক। কোন মেডিকাল ডিগ্রি না থাকা একজন সাইকলোজিস্ট কীভাবে একের পর এক রোগীকে এতো বড় মাপের একটা সার্জারি করার পরামর্শ দিয়ে যেতে পারেন, সেটা নিয়েও প্রশ্ন জাগতে পারে। কিন্তু যৌনতা, বিশেষ করে শিশু যৌনতা সম্পর্কে ডঃ মানির দর্শন সম্পর্কে জানার পর ব্যাপারটা অসুস্থ-বিকৃত মনে হলেও, আর অস্বাভাবিক মনে হয় না।

দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে তার বিভিন্ন বই, জার্নাল পেপার ও বক্তব্যে বার বার জন মানি ব্যাখ্যা করেছেন কেন শৈশবেই শিশুদের যৌনতার শিক্ষা দেয়া উচিৎ। টাইম ম্যাগাযিনের এপ্রিল, ১৯৮০ সংখ্যা মানি বলেন,

‘শৈশবের যৌন অভিজ্ঞতা – যেমন তুলমামূলক ভাবে বয়স্ক কোন ব্যক্তির সাথে যৌন মিলন – শিশুর জন্য নেতিবাচকই হবে এমন কোন কথা নেই’।

যদি কোন কোন পাঠক মানির উপরের কথার মধ্যে পেডোফিলিয়া বা শিশুকামিতার গন্ধ পেয়ে থাকেন তাহলে ডাচ পেডোফিলিয়া ম্যাগাযিন “পাইডিকা”-তে ১৯৯১ এর সাক্ষাতকারে বলা জন মানির নিচের কথাগুলো হয়তো অস্পষ্ট ছবিকে আরেকটু পরিষ্কার করবে –

“ধরুন আমি যদি দেখি ১০ বা ১১ বছর বয়সের একটি ছেলে বিশের বা ত্রিশের কোঠার কোন পুরুষের প্রতি তীব্র শারীরিক আকর্ষণ বোধ করছে, যদি তাদের সম্পর্ক পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে হয়, তাদের বন্ধন যদি পারস্পরিক হয়, তাহলে আমার মতে এধরনের সম্পর্ককে কোন ভাবেই বিকারগ্রসথ বা অসুস্থ (pathological) বলা যায় না।”

পেডোফিলিয়া বা শিশুকামের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে একই সাক্ষাৎকারে জন মানি বলেন –

“স্নেহময় শিশুকাম (affectional pedophilia) হল সহজ ভাষায় শিশুদের প্রতি স্নেহময় আকর্ষণ। অভিভাবক সুলভ ভালোবাসা ও বন্ধনের যৌন ভালোবাসা ও বন্ধনে পরিণত হওয়া। এই স্নেহময় সম্পর্ক, পুরুষ শিশুকামের ক্ষেত্রে পিতৃ সুলভ ভালোবাসার মতো। এতে কেবল পিতৃ সুলভ ভালোবাসার সাথে যৌন বা প্রেমময় বন্ধন যুক্ত হয়েছে। স্নেহময় ভালোবাসার সাথে প্রেম ও কামনা যুক্ত হয়েছে।”

পাইডিকার এডিটোরিয়াল বোর্ডের সদস্য ডাচ প্রফেসর থিও স্যানফোর্টের -Boys & Their Contacts with Men: A Study of Sexually Expressed Friendships – নামের বইয়ের ভূমিকাও লেখেন জন মানি। বইয়ের বিষয়বস্তু ছিল এগারো থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সের ছেলেদের প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের সাথে পায়ুকামের আনন্দঘন বর্ণনা। থিও স্যানফোর্টের দাবি বইয়ের প্রতিটি বর্ণনা অক্ষরে অক্ষরে সত্য। জন মানি এ বইয়ের ভূমিকায় লেখেন –

“২০০০ সাল ও তার পরে জন্ম নেওয়া প্রজন্মের জন্য আমরা হব ইতিহাস। শিশু যৌনতা ও এর মূলনীতির ব্যাপারে আমাদের আত্মকেন্দ্রিক, নৈতিকতা নির্ভর অজ্ঞতা নিঃসন্দেহে পরবর্তী প্রজন্মকে বিস্মিত করবে…শিশুকামিতা ততোটুকই ঐচ্ছিক, বাঁহাতি হওয়া বা অন্ধ হওয়া যতোটুক ঐচ্ছিক…এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অত্যন্ত ইতিবাচক বই।”

Development of paraphilia in childhood and adolescence – নামক প্রবন্ধে জন মানি বলেন –

“শিশুকাম স্বেচ্ছায় বেছে নেওয়া না, আর ইচ্ছে করলেই একজন শিশুকামি একে ছেড়ে আসতে পারে না। শিশুকামি যৌনতার ব্যাপারে ব্যক্তির সিদ্ধান্ত বা অনুরক্তি বা, বরং এটি যৌন-মনস্তাত্ত্বিক গঠন। একজন মানুষের শিশুকামি হওয়া বাঁহাতি বা কালার ব্লাইন্ড হবার মতো (অর্থাৎ বিষয়টি তার সিদ্ধান্ত এবং ইচ্ছার ঊর্ধ্বে)।”

শিশুকাম ছাড়া অন্যান্য যৌন বিকৃতির ব্যাপারেও মানির অবস্থান কম বিস্ময়কর না। জন মানি তার পাবলিক লেকচার এবং ক্লাসগুলোতে ইচ্ছাকৃত এমন সব বিষয় উপস্থাপন করতেন যা যে কোন বিবেচনায় চরম মাত্রার অশ্লীল হিসেবে গণ্য হবে। উইনিপেগের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে একবার অতিথি হয়ে লেকচার দিতে এসে প্রথমদিন উপস্থিত দর্শক, সাংবাদিক, প্রফেসর ও ফার্স্ট ইয়ার মেডিকাল ছাত্রদের সামনে মানি একটি ভিডিও উপস্থাপন করেন যেটাতে পশু কাম, মানব মূত্র পান, মানব বর্জ্য খাওয়া, অ্যাম্পুটেইশান ফেটিশ সহ বিভিন্ন যৌন বিকৃতির ছবি ও ভিডিও উপস্থাপন করা হয়। পরের দিন তিনি গ্রুপ সেক্সের একটি ভিডিও দেখান। ভিডিও শেষে ঘোষণা করেন, বিয়ে হল নিছক একটি অর্থনৈতিক বোঝাপড়া যেখানে হৃদয় মানিব্যাগের অনুসরণ করে। আর অযাচারকে অপরাধ বিবেচনা করা অনুচিত।

আধুনিক সেক্সোলজির অন্যান্য আরো অনেক শব্দের মতো প্যারাফিলিয়া (Paraphilia) শব্দটিও উদ্ভাবন করেন ব্যক্তিগত জীবনে উভকামি জন মানি। এর আগে বিকৃত যৌনাচারের ক্ষেত্রে “Perversion” বা “বিকৃতি” শব্দটি ব্যবহৃত হত। কিন্তু জন মানি প্যারাফিলিয়া শব্দের প্রচলন ঘটান। “বিকৃতি”- এর সাথে নেতিবাচকতা যুক্ত থাকে। জন মানি শিশুকাম, অজাচার ও উভকামিতাসহ নানা বিকৃত যৌনাচারকে নেতিবাচকতার কবল থেকে মুক্ত করে কেবল “অপ্রচলিত” হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেন। অন্যদিকে স্বাভাবিক যৌনাচারকে মানি সংজ্ঞায়িত করেন Normophilia হিসেবে। মানির ভাষায় Normophilia হল এমন সব ধরণের যৌনাচার যা কোন সমাজের বিদ্যমান মানদণ্ড অনুযায়ী – সেটা আইন, ধর্ম বা অন্য কোন কিছু হতে পারে – স্বাভাবিক (Norm) হিসেবে গণ্য হয়। অর্থাৎ যৌনতা কেবল প্রচলিত আর অপ্রচলিত। প্রথাগত আর প্রথাবিরোধী। প্রাকৃতিক ভাবে যৌনতার মধ্যে কোন ভালো বা মন্দ নেই। কোন সুস্থ যৌনতা আর কোন বিকৃত যৌনতা নেই। যৌনতার ব্যাপারে কেবল সমাজের ধারণা আছে। এভাবে ভাষার অত্যন্ত চাতুর্যপূর্ণ ব্যবহারের মাধ্যমে বস্তুত জন মানি সব ধরণের যৌনাচারকে স্বাভাবিক হিসেবে উপস্থাপন করেন। কারণ যদি কোন সমাজে শিশুকাম গ্রহণযোগ্য হয় তাহলে সেই সমাজের সেটাই প্রথা। এখানে নৈতিক বিচারে কোন জায়গা আর থাকে না। পুরো ব্যাপারটাই আপেক্ষিক। জন মানির জগতে কোন যৌনাচারই বিকৃত না। সব কিছুই স্বাভাবিক। তাই ৬/৭ বছরে বাচ্চাদের সমকামী যৌনতার অনুকরণে বাধ্য করা, যমজ দুই ভাইকে অজাচারের অনুকরণে বাধ্য করার সাথে “ঠিক বা ভুলের” কোন সম্পর্ক নেই।

ডেইভিড রাইমারের গল্পকে নিছক একজন ম্যাড সায়েন্টিস্টের পাগলাটে এক্সপেরিমেন্ট কিংবা একজন বিকৃতকামীর বিকৃতির বহিঃপ্রকাশ হিসেবে উড়িয়ে দেওয়া সহজ। কিন্তু বাস্তবতা হল তার নিজের দর্শনের জায়গা থেকে চিন্তার জায়গা থেকে ডঃ জন মানি নির্দোষ। মানির অপরাধ এবং রাইমারদের ট্র্যাজিক পরিণতি একটি নির্দিষ্ট দর্শন ও দৃষ্টিভঙ্গির ফলাফল। যদি এর থেকে আলাদা করে পুরো ব্যাপারটিকে একজন ব্যক্তির বিচ্ছিন্ন বিকৃতির ফলাফল হিসেবে চিত্রিত করা হয় তাহলে মূল সমস্যা ঢাকা পড়ে যায়। বিকৃতকামী, বিকৃত চিন্তার জন মানি নিঃসন্দেহে জঘন্য অপরাধী। কিন্তু তার অপরাধ হল উপসর্গ। মূল রোগ হল মানব যৌনতা ও যৌন- মনস্তত্ত্বের ব্যাপারে ঐ দর্শন ও দৃষ্টিভঙ্গি যার উপর ভর করে জন মানি তার কাজগুলোকে জায়েজ করছিল। আর এ দর্শনের মূলনীতিগুলো হল –

১) প্রতিটি মানুষ সর্বকামী (pansexual/omnisexual) হিসেবে জীবন শুরু করে। তারপর সে কোন এক বা একাধিক ধরনের যৌনাচারকে বেছে নেয়। এটি জন্মের সময় নির্ধারিত বা প্রাকৃতিক ভাবে নির্ধারিত না। প্রাকৃতিক ভাবে নারী ও পুরুষের মধ্যে যৌনতা সীমাবদ্ধ, এ কেবলই একটি সামাজিক প্রচলন।

২) মূলত সব ধরণের যৌনতাই স্বাভাবিক। সময়ের সাথে সাথে বিভিন্ন যৌনতার ব্যাপারে আমাদের ধারণা বদলায়। আমাদের সামাজিক চিন্তার কারণে আমরা কিছু যৌনাচারকে স্বাভাবিক আর কিছু যৌনাচারকে অস্বাভাবিক মনে করি।

৩) জন্মের পর থেকেই একজন শিশুর মধ্যে যৌনতার ধারণা ও বোধ বিদ্যমান থাকে। একারণেই শিশুকাম বা অজাচার অস্বাভাবিক কিছু না। কালার ব্লাইন্ড বা বাঁহাতি হবার মতো। সমাজের বিদ্যমান নৈতিকতার কাঠামো কারণে আমরা এ কাজগুলোকে অপরাধ বা বিকৃতি মনে করি।

ভয়ঙ্কর ব্যাপারটা হল এই চিন্তাগুলো জন মানির একার বিচ্ছিন্ন চিন্তা না। বরং পশ্চিমের আধুনিক যৌন-চিন্তা এ মূলনীতিগুলোকে সর্বজনীনভাবে স্বীকার করে। এবং গত চার দশক বা আরো বেশি সময় ধরে এর অসংখ্যবার এ সত্য প্রমাণিত হয়েছে। মৃত্যুর পরও জন মানির চিন্তা তার প্রভাব জানান দিচ্ছে। গত বেশ ক’বছর ধরে পশ্চিমে “ট্রান্সজেন্ডার রাইটস” নিয়ে আন্দোলন গড়ে উঠেছে। মিডিয়ার মাধ্যমে ব্যাপকভাবে এ আন্দোলনকে সমর্থন দেওয়া হচ্ছে। “৫২ বছর বয়েসী ৭ সন্তানের ব্যাপারে এখন ৬ বছরের ট্রান্সজেন্ডার মেয়ে হিসেবে পরিচিত হতে চান”, “ব্রিটেনের প্রথম জেন্ডার ফ্লুয়িড পরিবার: বাবা নিজেকে নারীতে পরিণত করছেন, মা নিজেকে পুরুষ মনে করেন, আর ছেলে বড় হচ্ছে জেন্ডার নিউট্রাল হিসাবে” – এধরনের খবর আশঙ্কাজনক বেড়ে গেছে। সাম্প্রতিক এক রিপোর্ট অনুযায়ী ব্রিটেনে প্রতি সপ্তাহে ৫০ জন শিশুকে Gender Dysphoria ও Gender Change সঙ্ক্রান্ত ক্লিনিকে পাঠানো হচ্ছে, যার মধ্যে ৪ বছর বয়েসী শিশুও আছে। ব্যাপারটা কী? পশ্চিমা বিশ্বে সবাই কি রাতারাতি হিজড়া হয়ে যাচ্ছে?

সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী প্রতি ২০০০ জনে ১ জন True Hermaphrodite বা intersex ব্যক্তিকে পাওয়া যায়। জনসংখ্যার ০.০৫% । এছাড়া বাকি ৯৯/৯৫% মানুষ হয় নারী অথবা পুরুষ। অর্থাৎ মানুষের পরিচয় বাইনারি। অথচ এখন যে কোন মানুষ বা শিশু যদি বলে সে একজন নারী হিসেবে, বা পুরুষ হিসেবে, বা অন্য কোন “কিছু” হিসেবে পরিচিত হতে চায়, তবে তাই ধরে নিতে হবে। সে শারীরিকভাবে, জন্মসূত্রে যাই হোক না কেন! নিউ ইয়র্কে আইনি ভাবে ৩১ টি লৈঙ্গিক পরিচয়কে (Gender Identity) স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ফেইসবুকে কোন জায়গায় ৬০টি, কোন জায়গায় ৭১ টি জেন্ডার আইডেন্টিটির লিস্ট থেকে “নিজের পরিচয়” বেছে দেওয়া অপশান দেওয়া আছে। ল’রিয়েল, ফোর্ড, নাইকি, টার্গেটসহ বিভিন্ন মেগা ব্র্যান্ড তাদের বিজ্ঞাপনে খোলাখুলি ট্রান্সজেন্ডার মডেলদের ব্যবহার করছে। বিভিন্ন ফ্যাশন হাউস জেন্ডার নিউট্রাল/জেন্ডার ফ্লুয়িড পোশাক বের করা শুরু করেছে। ব্রিটিশ ডিপার্টমেন্ট স্টোর জন লুইস ঘোষণা করেছে তারা বাচ্চাদের পোশাক আর “ছেলে” বা “মেয়ে” ট্যাগ দিয়ে আলাদা করবে না। এখন থেকে তারা বাচ্চাদের শুধু “Unisexz”/”Gender Neutral” পোশাক বিক্রি করবে।

মার্চে টাইম ম্যাগাযিন মানুষের মৌলিক পরিচয় ও যৌনতার পরিবর্তনশীল সংজ্ঞার এ যুগ নিয়ে কাভার স্টোরি করেছে। Beyond ‘He’ or ‘She’: The Changing Meaning of Gender and Sexuality – শিরোনামের এ লেখায় সমকামী অধিকার নিয়ে কাজ করা অ্যাডভোকেসি গ্রুপ GLAAD এর একটি জরিপের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে অ্যামেরিকার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তরুণ এখন আর নিজেদের সম্পূর্ণভাবে স্বাভাবিক যৌনাচারে আকৃষ্ট (Heterosexual) অথবা সম্পূর্ণ ভাবে সমকামিতায় আকৃষ্ট মনে করে না। বরং “মাঝামাঝি কিছু একটাকে” বেছে নেয়। একইভাবে অ্যামেরিকান তরুনদের এক-তৃতীয়াংশ “পুরুষ” বা “নারী” হিসেবে নিজেদের পরিচয় দেয় না। অ্যামেরিকাসহ পশ্চিমের অনেক দেশে “ট্রান্সজেন্ডার টয়লেট অধিকার” নিয়ে আন্দোলন চলছে। যার মূল সারমর্ম হল একজন পুরুষ যদি নারী হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে তাহলে নারীদের জন্য নির্ধারিত টয়লেট ব্যবহার করতে পারা তার আইনগত অধিকার। এমনকি কিছু কিছু জায়গায় যদি একজন পুরুষ যদি নিজেকে মেয়ে বলে পরিচয় দিতে চায় আর আপনি যদি তার ক্ষেত্রে he/him/his – ইত্যাদি সর্বনাম ব্যবহার করেন তবে সেটাকে বেআইনি ঘোষণা করার চিন্তাভাবনা চলছে। কারণ এটা ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, মানবাধিকার ক্ষুণ্ণ করা এবং বৈষম্য। এমনকি কিছুদিন আগে বাংলাদেশের ডেইলি স্টার তাদের সাপ্তাহিক সাপ্লিমেন্ট “Lifestyle” এ Gender fluidity/ Gender Neutrality – কে সমর্থন করে কাভার স্টোরি করেছে।

ঠিক দু’দশক আগে যেভাবে সমকামিতার স্বাভাবিকীকরন ও গ্রহণযোগ্যতা তৈরির জন্য মিডিয়াকে ব্যবহার করা হয়েছিল, বর্তমানে “ট্রান্সজেন্ডার রাইটস”-এর নামে ঠিক একই কাজ করা হচ্ছে। “যৌনতা, ব্যক্তি পরিচয় এসবই আপেক্ষিক। ব্যক্তির স্বাধীন সিদ্ধান্তের বিষয়। একজন মানুষ ভেতরে কেমন তাই মুখ্য। সামাজিক প্রথা আর পশ্চাৎপদতার কারণে মানুষের মধ্যে ভেদাভেদ সৃষ্টি উচিৎ না। যখন কারো ক্ষতি হচ্ছে না তখন বিরোধিতা কেন?” – ইত্যাদি বিভিন্ন কথার মাধ্যমে এই বিকৃতি ও অসুস্থতাকে স্বাভাবিক, নির্দোষ কিছু হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা চলছে। আর এসব কিছুর মূলে আছে ডঃ জন মানির থিসিস ও ধারণা। তার কিছু অনুসিদ্ধান্ত বাদ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সার্বিক ভাবে তার এসব ধারণাকে গ্রহণ করা হয়েছে। তার তৈরি করা (কু)যুক্তি, ভাষা ও অপ-বিজ্ঞানের কাঠামোর মধ্যে দিয়েই এ বিকৃতিকে মিডিয়া, সাইকলোজিস্ট এবং সেক্সোলজিস্টরা জায়েজ করার চেষ্টা করছে। এর স্বপক্ষের বয়ান তৈরি করছে। যৌনতার ব্যাপারে পশ্চিমের বর্তমানের যে দৃষ্টিভঙ্গি তা অনেকাংশেই জন মানির অবয়বে গড়া। ডেইভিড রাইমারের গল্প আর জন মানির অপরাধকে বুঝতে হলে ও বাস্তবতার আলোকেই বুঝতে হবে।

তবে জন মানির ধারণাগুলো তার নিজের ছিল না। সে এগুলোকে সুবিন্যস্ত কাঠামো দিয়েছিল সত্য, কিন্ত তা গড়ে উঠেছিল আরেকজনের স্থাপিত ভিত্তির উপর। একারণেই নিউইয়র্ক টাইমস বুক রিভিউ জন মানির “Man & Woman, Boy & Girl”- বইয়ের রিভিউতে বলেছিল, এ বইটি হল সেক্সোলজি সম্পর্কে শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের লিস্টে দ্বিতীয়। লিস্টের প্রথম বই কোনটা? পশ্চিমা যৌন চিন্তা সম্পর্কে লিখিত শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের লেখক কে? যৌনতা সম্পর্কে জন মানিসহ অগণিত গবেষক ও সাইকলোজিস্টের এবং সার্বিকভাবে পশ্চিমের চিন্তার ভিত্তিপ্রস্তর কে স্থাপন করেছিল? যে তিনটি মূলনীতির উপর ভিত্তি করে জন মানি তার বিকৃত উপসংহারে পৌঁছেছিল, কে ছিল সেগুলোর প্রবক্তা?

এ প্রশ্নগুলোর জবাব পেতে হলে আমাদের জানতে হবে ডঃ কিনসির ব্যাপারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন:
Share on Facebook5Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Email this to someonePrint this page

সর্বশেষ সংবাদ

Developed by: