মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ১০ আশ্বিন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ |
শিরোনাম
সিম রেজিস্ট্রেশনে আর কাগজ-কলম লাগবে না  » «   টাইফুন ‘জেবি’র আঘাতে লণ্ডভণ্ড জাপান, নিহত ৯  » «   রোনালদোর বেতন তিন গুণ বেশি!  » «   দ্বিতীয়বার সিলেটের মেয়র হিসেবে শপথ নিলেন আরিফ  » «   যে নামগুলো পাসওয়ার্ড হিসেবে ব্যবহার করবেন না  » «   ট্রাম্পের ‘প্যান্ট’ খুলে দিল যে বই  » «   নিরাপদ সড়ক আন্দোলন: ঘটনাই ঘটেনি, মামলা করে রেখেছে পুলিশ  » «   ‘অ্যাওয়ে গোল’ বাতিল করো, দাবি মরিনহো-ওয়েঙ্গারদের  » «   শহিদুলকে প্রথম শ্রেণির বন্দীর সুবিধা দিতে নির্দেশ  » «   আরপিও সংশোধন নিয়ে নির্বিকার নির্বাচন কমিশন  » «   মাহাথিরের রসিকতায় শ্রোতাদের মধ্যে হাসির রোল!  » «   দেশের বাইরে রান করাটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখি : মুশফিক  » «   দুর্দান্ত জয়ে সিপিএলের শীর্ষে মাহমুদুল্লাহরা  » «   খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবিতে বিএনপির ২ দিনের কর্মসূচি  » «   আদালতকে খালেদা জিয়া : ‘আমার অবস্থা খুবই খারাপ’  » «  

ট্রাম্প রাজত্বে আর্থ-সামাজিক হালচাল

রেফায়েত ইবনে আমিনঃ
২০১৬ সালের নভেম্বর মাসের পর থেকেই বিশ্বের অনেকেই চিন্তা করছেন, কেন এমন হলো? কীভাবে এমন হলো? প্রশ্নটা অ্যামেরিকান প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে। কীভাবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মত অশালীন, দাম্ভিক, শিষ্টতাবর্জিত এক ব্যক্তি বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিধর দেশের ক্ষমতায় নির্বাচিত হল? এ নিয়ে অনেক অনেক আলোচনা হয়েছে, অনেক ব্যাখ্যা, অ্যানালাইসিস হয়েছে, নানান মুনি নানান মত দিয়েছেন, প্রচুর কচলা–কচলি হয়ে গেছে; কিন্তু মোদ্দাকথা হলো ট্রাম্প তো জিতে গেছেই, এটা তো আর ফিরানো যাবে না। অ্যামেরিকানরা তো এর ফলভোগ করছেই, সেই সঙ্গে অযাচিতভাবে সমগ্র বিশ্বের মানুষেরাও এর প্রভাব থেকে রেহাই পাচ্ছে না।
সবচেয়ে কলঙ্কজনক ব্যাপার হলো, আমি যেই স্টেটে বাস করি, ওহাইও, এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ সুইং স্টেট। এবং গত কয়েক দশকের অ্যামেরিকার প্রতিটা প্রেসিডেনশিয়াল নির্বাচনে ফ্লোরিডা ও ওহাইও বারেবারেই কিছু না কিছু ভূমিকা পালন করেছে – যার অধিকাংশই ছিলো বিতর্কিত। ২০০০ সালে জর্জ বুশ ও আল গোরের নির্বাচনের সময়ে ফ্লোরিডার ভোট–গণনা সারা বিশ্বের সামনে একটা হাস্যকর ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। ২০১৬ সালের নির্বাচনেও ওহাইও, মিশিগান ও পেনসিলভানিয়া – এই তিন স্টেটের ভোট গণনা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বুঝা গিয়েছিলো যে, হিলারী ক্লিন্টনের জেতার সম্ভাবনা অতি ক্ষীণ।
কেউ কেউ বলেন যে মহিলা–প্রার্থী বলে হিলারী জিততে পারে নাই। আমি অবশ্য ব্যক্তিগতভাবে সেটা মেনে নিতে পারি না। গত বিশ বছরে আমি এদেশের সকল স্তরের মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করেছি। আর আমার কাজের জন্য, সর্বক্ষণই বিভিন্ন শহরে ও গ্রামে ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছি – তাই আমার কাছে মনে হয় না, মহিলা হওয়ার কারণে হিলারী হেরেছে। আমি দেখি ট্রাম্পের ধূর্ততা, অসততা, যে কোন কিছুকে মিথ্যার আবরণে জোর গলায় সত্য বলে চালিয়ে দেওয়া – এসমস্ত কিছু কারণ। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, এরকম একজন মানুষকে কিন্তু লাখে লাখে অ্যামেরিকান বিশ্বাসও করেছে এবং এখনও করছে। যদিও এদের অধিকাংশকেই আমরা বলি যে রেডনেক, বা অল্পশিক্ষিত সাদা গ্রাম্য–পরিবেশের মানুষ। আমি অনেক অনেক ট্রাম্প সাপোর্টারের সাক্ষাৎ পেয়েছি যারা অতি উচ্চশিক্ষিত, খুবই ভালো চাকরিবাকরি বা ব্যবসা করে। সমাজের বড় বড় পোস্টে আছে – ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল, শিক্ষক সবাই আছে। তারা কেন এরকম একটা অসভ্য মানুষকে সাপোর্ট করে? কেউ কেউ করে অন্ধের মত পার্টির প্রার্থীকে সাপোর্ট করতে হবে বলে। আবার কেউ কেউ করে অন্য প্রার্থীর অযোগ্যতাকে বড় করে দেখেছে বলে। তাদের কাছে, ট্রাম্পের দোষগুলো ক্ষমার যোগ্য কিন্তু হিলারী যা যা করেছে সেগুলোকে তারা কোনমতেই মেনে নিতে পারে না।
অনিচ্ছাকৃত হলেও, মিডিয়াই কিন্তু ট্রাম্পকে অনেক সাহায্য করে দিয়েছে। সে শুরু করেছিলো সার্কাসের এক ক্লাউনের মত, তাকে প্রথম থেকেই পাত্তা না দিলেই সে কিন্তু আর লাইমলাইটে থাকে না। তার অদ্ভুত আচার–আচরণ বারে বারে মিডিয়াতে প্রচার করে করে তাকে আরো বেশী উদ্বুদ্ধ করে তুলেছিলো মিডিয়াগুলোই – টিভি, রেডিও, সংবাদপত্র। বিশেষ করে যদি প্রথম থেকেই তার “বুলি” (ইঁষষু) করার স্বভাবের কারণে, সকলে মিলে যদি তাকে বয়কট করতো, তাহলেই সে আর পানি পেত না। বরং দেখা গেলো, মিডিয়াতে সেই বুলিগুলোর প্রচার ভালই চলেছে। সেটা অত্যন্ত নেতিবাচক। কথায় কথায় তার প্রতিপক্ষকে সে একটা নাম দিয়ে দেয় – ক্রুকেড হিলারী, লিটল মার্কো, স্লপি স্টিভ, লো–এনার্জি কার্সন, লিটল রকেটম্যান ইত্যাদি। এগুলো কোন সভ্যতার লক্ষণ নয়।
ট্রাম্পের আর একটা চতুর চাল হলো, যখনই সে কোন সমস্যার মুখোমুখি হয়, তখনই সে, সবার দৃষ্টি অন্য আর একটা নতুন কিছুর দিকে ঘুরিয়ে দিতে সক্ষম হয়। দরকার হলে সে আর্টিফিশিয়ালি একটা সংকট সৃষ্টি করে সবার আকর্ষণ সেদিকে নিয়ে চলে যায় এবং সকলে তখন প্রথম সমস্যার কথা বেমালুম ভুলে যায়, বা চাপা পড়ে যায়। অস্বাভাবিকভাবে হলেও সত্যি যে, এই পদ্ধতি কাজ করেছে। আর এই এক বছরে এত্তো এত্তো সমস্যা সৃষ্টি হয়ে গিয়েছে যে, মানুষজন আর কুল–কিনারা করে উঠতে পারছে না, কোনটা ছেড়ে কোনটাকে ফলো করবে। সে নিজে অবশ্য বেহায়ার মত কোনটাকেই পরোয়া করে না।
আর এক গ্রুপ আছে, তারা চিরাচরিত পলিটিশিয়ানদের উপরে অতিষ্ঠ হয়ে গেছে। পলিটিক্স সব দেশেই একটু নোংরামীর ধার ঘেঁষে চলে, অ্যামেরিকাতেও এর ব্যতিক্রম নয়। অনেক অনেক বছর ধরে সাধারণ মানুষেরা দেখেছে তদের জীবনযাত্রার মান ধীরে ধীরে নীচের দিকে নামছে। এখানে ভুল বুঝবেন না। অ্যামেরিকার সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষজনের জীবনযাত্রার যেরকম উন্নত মান এবং এত আরাম–আয়েশ–শান্তি আছে এখানের জীবনে, এই কোয়ালিটি অল্প একটু নীচে নামলেও, এখনও, এই মুহূর্তেও ট্রাম্পের আমলেই আমরা সব অ্যামেরিকার মানুষজন বেশ সুখেই আছি, আরামেই আছি। অন্য প্রায় সব দেশের তুলানাতেই অনেক অনেক ভাল আছি। তারপরেও, মানুষ দেখে যে, “যায় দিন ভালো”। এসমস্ত অনেক অধোগতির জন্যই পলিটিশিয়ানদের দায়ী করে থাকে। সেই হিসাবে হিলারী ক্লিন্টন একটা বড়সড় টার্গেট। ধুরন্ধর ট্রাম্প সেটাকে কাজে লাগিয়ে নিজেকে একজন নন–পলিটিশিয়ান এবং সাধারণ মানুষের হিতৈষী হিসাবে জাহির করে অনেককে বোকা বানাতে পেরেছিলো। তার একটা স্লোগান ছিলো, আমি ওয়াশিংটন ডিসি–র পলিটিশিয়ানদের ডোবা সাফ–সুত্রো করে দিবো – “ফৎধরহ ঃযব ংধিসঢ়”। মানুষও তাকে কেন জানি বিশ্বাস করেছিলো। হিলারী এই পয়েন্টে বড় একটা ধাক্কা খেয়েছিলো।
আরো একদল আছে, যারা ডেমোক্র্যাট এবং বার্নী স্যার্ন্ডাস্কে পছন্দ করতো। তার নীতি–মতবাদ পলিসি খুবই জনপ্রিয়তা পেয়েছিলো – বিশেষ করে অল্প–বয়সী নতুন জেনারেশানের মাঝে। শেষমেশ যখন ডেমোক্রেটিক পার্টি থেকে হিলারী মনোনয়ন পেলো, তখন বার্নীর এই তরুণ সাপোর্টাররা অনেক দমে গেলো। তারা নির্বাচন থেকেও দূরে সরে গেলো। হিলারী কিন্তু তাঁদেরকে ফিরিয়ে আনার বেশী চেষ্টা করে নাই। হিলারী সবচেয়ে বড় একটা ভুল করেছে তার ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্ধারণে। যদি বার্নী স্যার্ন্ডাস্কে ভাইস–প্রেসিডেন্ট হিসাবে নিয়ে নিতো, তাহলে অটোম্যাটিক্যালি বার্নীর সব সাপোর্টারকে হিলারী তার পক্ষে পেয়ে যেত। দেখা গেলো, বার্নীর বদলে, টিম কেইনকে ভাইস–প্রেসিডেন্ট হিসাবে নিয়েছিলো। সেটা একটা মারাত্মক ভুল ছিলো। হিলারীর স্বভাবচরিত অতিরিক্ত আত্ম–প্রত্যয়ের কারণে, সে নিজেই নিজের ক্ষতি করলো।
আমরা সাধারণ মানুষরা অ্যামেরিকার সাম্প্রতিককালের অর্থনীতির উত্থান–পতনের সঙ্গে রাজনীতির কিছুটা সাদৃশ্য লক্ষ্য করেছি। জর্জ বুশ (সিনিয়র) যখন ১৯৮৯ সালের দিকে প্রেসিডেন্ট হলেন, তিনি ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং অন্যান্য অনেক পলিসির কারণে অর্থনীতিতে মন্দাভাব আনলেন। এরপরে বিল ক্লিন্টন এসে ধীরে ধীরে অর্থনীতিকে চাঙা করে তুললো। দেশের মানুষের অবস্থা কিছুটা ফিরলো। আট বছর মানুষ বেশ সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে গেলো। এরপরে জর্জ বুশ এসে আফগানিস্তান ও ইরাকের সঙ্গে দুই দুইটা যুদ্ধ শুরু করে দিয়ে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার সেদিকে ঢাললো। দেশের মানুষের তখন ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা – স্টক মার্কেট, হাউজিং, ইন্ডাস্ট্রি সব কিছুতেই ধস নামলো। সারা বিশ্বে শুরু হলো গ্রেট ইকোনমিক ডিপ্রেশান।
এরপরে এলো বারাক ওবামা। তার পলিসি আবার দেশকে উন্নতির দিকে নিয়ে চললো। সাদা চোখে দেখলে বলা যায় – আট বছর ধরে ক্লিন্টন দেশকে তুললো, পরের আট বছর জর্জ বুশ টেনে নামালো, আবার পরের আট বছর ওবামা টেনে তুলে উপরে তুললো। এখন ট্রাম্প মুফতে বসে নিজের কৃতিত্ব দাবী করছে। সে যেন একবছরেই সব পালটে দিলো। সে নিজের গুণকীর্তন নিজেই করে আর তার অন্ধ সাপোর্টাররা সেটাই বিশ্বাস করে।
আমার মনে হয়, এব্যাপারে বর্তমান ডেমোক্র্যাট পার্টির ব্যর্থতা বেশী। কই তারা তো উপরের চিত্রটাকে মানুষের সামনে তুলে ধরে ক্লিন্টন–ওবামার কৃতিত্ব দাবী করে না। হিলারীও তার নির্বাচনী প্রচারণায় এইটা বলে নাই। আমি হয়তো নিজে অ্যানালাইসিস করে এটা বুঝতে পারছি, কিন্তু আপামর জনসাধারণকে এটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে না দিলে, ট্রাম্পের মত ধুরন্দর কপট ব্যক্তিত্ব আজীবনই এর ফায়দা লুটে যাবে।
নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পরে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির আর একটা বড় দুর্বলতা প্রকট হয়ে দেখা যাচ্ছে – তাদের মধ্যে নেতৃত্বের অভাব। ট্রাম্প একের পর এক যা–খুশী–তাই করেই যাচ্ছে; খুবই জোরালো ভাবে কোন ক্যারিশমাটিক, পপুলার লীডার ডেমোক্র্যাটিক পার্টি থেকে এগুলোর কোন জবাব দিতে পারছে না। পার্টিকে এক করে তুলতে পারছে না। খুব দুর্বলভাবে ট্রাম্পের বদ আচার–আচরণকে তুলে ধরা হচ্ছে। তার এবং রিপাবলিকান পার্টির স্বেচ্ছাচারিতাকে কেউ চ্যালেঞ্জ করতে পারছে না, বলশালী ও শক্ত একটা নেতৃত্বের অভাবে।
একজন সচেতন অ্যামেরিকান নাগরিক হিসাবে, এবং একই সঙ্গে একজন বিশ্ব–নাগরিক হিসাবে আমি সবসময়ই চাই, সবদেশে যেন সবসময়ই সুশাসন থাকে। আমরা সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় থাকবো।

সংবাদটি শেয়ার করুন:
Share on Facebook
Facebook
0Share on Google+
Google+
0Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin
Email this to someone
email
Print this page
Print

সর্বশেষ সংবাদ

Developed by: