সোমবার, ২৮ মে ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ |
শিরোনাম
তৃতীয়বার আইপিএল চ্যাম্পিয়ন চেন্নাই সুপার কিংস  » «   নগরীর অভিজাত শপ-রেস্টুরেন্টে ভ্রাম্যমাণ আদালতের জরিমানা  » «   রাশিয়ার মিসাইলেই বিধ্বস্ত হয় মালেশিয়ার বিমান: তদন্ত দল  » «   রাজস্থানকে বিদায় করে কোয়ালিফায়ারে কলকাতা  » «   সুনামগঞ্জে বজ্রপাতে কৃষক নিহত  » «   নগরীতে বাসের ধাক্কায় ব্যবসায়ী নিহত  » «   ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ২ কোটি টাকার বিদেশি মুদ্রাসহ যাত্রী আটক  » «   ধীরে ধীরে ইসলাম ধর্মের প্রতি আমি দুর্বল হয়ে যাচ্ছিলাম  » «   অভিনেত্রী তাজিন আহমেদ আর নেই  » «   খাবারে ভেজাল মেশানো বড় পাপ : বিভাগীয় কমিশনার  » «   চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালঃ রিয়ালের বড় বাধা সালাহ!  » «   খুলনায় নির্বাচন কমিশন ব্যর্থ: সুজন  » «   লোকবল আর প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাবে ধ্বংস হচ্ছে লাউয়াছড়া বন ও বন্যপ্রাণী  » «   গোয়াইনঘাটে ২০ দিন ধরে যুবক নিখোঁজ  » «   ১৪১ বাংলাদেশি যাত্রী নিয়ে সৌদি বিমানের জরুরি অবতরণ  » «  

পরাজিত মানসিকতা

আসিফ আদনানঃ
স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হয়েছে। পাঁচ দশক জুড়ে অধিকাংশ মানুষের চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করা বাস্তবতাকে বিশ্লেষণের কাঠামো হঠাৎ করেই অচল হয়ে গেলো। বদলে গেলো দ্বি-কেন্দ্রিক বিশ্বের সমীকরণ। এমন সময়েই, ফ্রান্সিস ফুকোইয়ামা নামের জন্স হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের এক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বলা শুরু করলেন পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থাই মানব ইতিহাসের সামাজিক ও রাজনৈতিক উৎকর্ষের চূড়া। মানবজাতির অগ্রগতির একমাত্র পথ ও আদর্শ হল উদারনৈতিক গণতন্ত্র, সর্বজনীন মানবাধিকার আর পুঁজিবাদী মুক্তবাজার অর্থনীতির সমন্বয়ে গঠিত এ বিশ্বব্যবস্থা। এ দাবি অনেকেই স্ব-প্রমাণিত সত্য হিসেবে মেনে নিলেন।
.
অন্যরকম একটা বিশ্লেষণ তুলে ধরলেন হার্ভার্ডের স্যামুয়েল হান্টিংটন। ৯৩-এ ফরেন অ্যাফেয়ার্সে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে তিনি বললেন – স্নায়ুযুদ্ধের পরের বিশ্বে সংঘাতের ধরণ বদলে যাবে। ভবিষ্যতের যুদ্ধগুলো আগের মতো বিভিন্ন দেশের মধ্যে হবে না, হবে বিভিন্ন সভ্যতার মধ্যে। অ্যামেরিকা কেন্দ্রিক পশ্চিমা বিশ্ব ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে ইসলাম। হান্টিংটন তার এ প্রবন্ধের নাম দেন – সভ্যতার সংঘাত (The Clash of Civilizations)।
.
কিন্তু কেন সভ্যতা? কেন দর্শন বা মতবাদের সংঘাত না?
.
হান্টিংটন সভ্যতাকে সংজ্ঞায়িত করলেন ব্যক্তির ধর্ম, মূল্যবোধ, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা পরিচয় (Identity) হিসাবে। এ সংজ্ঞা অনুযায়ী একজন ব্যক্তি কোন সভ্যতার অংশ, সেটাই তার পরিচয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সম্পূর্ণ মাপকাঠি। পশ্চিমা সভ্যতার অংশ হবার অর্থ ধর্ম, মূল্যবোধ, সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে পশ্চিমের অবস্থান থেকে দেখা। এসব ক্ষেত্রে পশ্চিমের ব্যাখ্যা ও চিন্তার কাঠামো গ্রহণ করা। ভৌগলিকভাবে পশ্চিমে অবস্থান করা, গায়ের চামড়া একটা নির্দিষ্ট রঙ – এর হওয়া আবশ্যক না। কারণেই হান্টিংটন দাবি করলেন ভবিষ্যতে রাজনৈতিক আদর্শ বা স্বার্থের বদলে মানুষের মধ্যেকার দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের মূল উৎস হবে তাদের সভ্যতাকেন্দ্রিক পরিচয়।
“আপনি কার দলে?” এ প্রশ্নের চাইতে “আপনি কে?” এই প্রশ্ন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে
.
হান্টিংটন ইসলামকে একটি সভ্যতা হিসেবে ক্যাটাগরাইয করলেন। কারণ তিনি বুঝতে পেরেছিলেন ইসলাম নিছক একটি ধর্ম না, বরং স্বতন্ত্র আক্বিদা, মূল্যবোধ, সংস্কৃতি, শাসন ব্যবস্থা ও ইতিহাসের সমন্বয়ে গড়া, যা কোন দর্শন, দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধকে স্বীকৃতি দেয় না। মুসলিমরা ভাঙ্গতে কিংবা মচকাতে পারে, ইসলাম বদলায় না। একারণেই পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আসবে ইসলামের দিক থেকে।
.
মানব জাতির ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখবেন চক্রাকারে দেশ ও জাতিগুলোর উত্থান-পতন ঘটতে থাকে। চলতে থাকে ভাঙ্গাগড়া খেলা। একসময়ের সুপারপাওয়ার ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। সময়ের পালাবদলে সভ্যতার কেন্দ্র পরিণত হয় একসময়ের পশ্চাৎপদ অঞ্চল। পেন্ডুলাম নিয়ম করে দুলতে থাকে। একবার পশ্চিমের দিকে আসে, তারপর ধীরে ধীরে আবার পূর্বের দিকে যায়।
.
তবে একটি সভ্যতার উত্থান থেকে পতনের মাঝে কয়েক শতাব্দী সময় লাগায়, আমরা অধিকাংশ মানুষ প্যাটার্নগুলো খেয়াল করি না। যেমন প্রতিটি সভ্যতা পতনের আগে অবাধ যৌনতা, বিকৃতি ও অধঃপতনের চরম সীমায় পৌঁছে যায়। রোমান, বাইযেন্টাইন, মিশরীয়, গ্রিক, ব্যাবিলন – প্রমাণ পাওয়া যায় বিভিন্ন সভ্যতায়। নষ্ট হয়ে যায় সামাজিক ও রাজনৈতিক সংহতি। দীর্ঘদিন ধরে চলা বৃদ্ধির পর অর্থনীতির উল্টো গতি শুরু হয়। কিন্তু ভোগে অভ্যস্ত জনসাধারণের মানসিকতার পরিবর্তন হয় না।
.
একটি সভ্যতার পতনের পর নতুন যে সভ্যতা তার জায়গা দখল করে, সেটা অধিকাংশ ক্ষেত্রে মৌলিকভাবে আলাদা হয়। অর্থাৎ অনুকরণের মাধ্যমে একটি সভ্যতা আরেকটিকে পরাজিত করতে পারে না। বরং নিজের আলাদা পরিচয়, সংস্কৃতি ও আদর্শের অনুসরণের মাধ্যমে সে শক্তি অর্জন করে। আর যে বিদ্যমান সভ্যতার অনুকরণ করে যায়, তারা ঐ সভ্যতার অংশ হতে পারে, কিন্তু কখনো প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে না।
.
গত প্রায় তিনশো বছর ধরে পেন্ডুলাম হেলে আছে পশ্চিমের দিকে। জ্ঞানে, বিজ্ঞানে, প্রযুক্তি আর আর্থিক দিক দিয়ে পশ্চিমা বিশ্ব মুসলিমদের চেয়ে অনেক এগিয়ে গেছে। একারণে মুসলিমদের মধ্যে অনেকেই এ সভ্যতাকে চিরন্তন ধরে নিয়েছেন। কিছু করতে হলে এ সিস্টেমের মধ্যেই করতে হবে, এ সভ্যতার অংশ হয়েই করতে হবে, এ ধারণা তার চিন্তাচেতনায় বদ্ধমূল হয়ে গেছে। তারা হয়তো ধর্ম বিশ্বাসের দিক থেকে মুসলিম কিন্তু সভ্যতার দিক থেকে পশ্চিমা।
.
ধর্মের ভূমিকা, ইতিহাস, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ, চিন্তা সবই তারা নিচ্ছে পশ্চিমের কাছ থেকে। পশ্চিমের কাঠামোয় চিন্তা করছে। তাদের চিন্তার মূল কেন্দ্র হয়ে গেছে শাসন ব্যবস্থা, অর্থনীতি, সামাজিক আচার-আচরণ, মানবাধিকার, ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইসলাম কী বলে সেটার চাইতে কীভাবে বিদ্যমান ব্যবস্থাকে কিছুটা ইসলামি ফ্লেভার দেয়া যায় সেটা । ইসলাম প্রতিষ্ঠার বদলে তারা বেছে নিয়েছে ইসলামাইযেইশানকে। চিন্তার মাপকাঠি এখানে পশ্চিমা মূল্যবোধ। হারাম-হালালের নির্ধারক পশ্চিমা সেন্সিটিভিটি। হান্টিংটন যে সত্য অনুধাবন করতে পেরেছিল এ মুসলিমরা সেটা বুঝলো না। তারা ফুকোইয়ামার কথাকেই মেনে নিলো।
.
চিন্তার এ পরাজয় বিভিন্ন ভাবে প্রকাশ পাচ্ছে। তবে সবচেয়ে সহজে এ ফেনোমেনা বোঝার উপায় হল পশ্চিমা সভ্যতার সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্য ইসলামের সর্বজনস্বীকৃত নানা বিষয়কে নতুন ভাবে ব্যাখ্যা করার প্রবণতা। এটা নানা ভাবে হচ্ছে। কেউ কুরআনের আয়াত নতুন ভাবে ব্যাখ্যা করছে, কেউ ঈমান ও কুফর, মুমিন ও কাফিরের নতুন সংজ্ঞা দিচ্ছে, কেউ পশ্চিমা স্মার্টনেসের ইসলামিকরণের জন্য ইচ্ছেমতো রাসূলুল্লাহর ﷺ জীবনীকে ব্যাখ্যা করছে। সমকামিতা, অ্যান্ড্রোজিনির মতো যেসব চরম মাত্রা বিকৃতিকে মেনে নেয়া পশ্চিমারা আধুনিক হবার স্ট্যান্ডার্ড বানিয়েছে, সেগুলোকে হালকা ভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছে।
.
এ সব কিছু মূল কারণ হল তারা একটি উপসংহারকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছে। আর এ উপসংহারের সাথে মেলানোর জন্য বাকি সব কিছু বদলে নিচ্ছেন। পশ্চিমা সভ্যতার বিরোধিতার বদলে তারা পশ্চিমের অনুসরণকে বেছে নিয়েছেন। আর এ জন্যই তারা ইসলামকে কাস্টোমাইয করছে। কিন্তু তারা যেটাকে উৎকর্ষ মনে করছে, যেসব মন জোগানো মুখস্থ রেটরিক আওড়ানো আর ব্যাখ্যা দেয়াকে ক্রেডিটের বিষয় সেটা আদতে চরম মাত্রার বুদ্ধিবৃত্তিক পরাজয়। পশ্চিমা চিন্তার ইসলামাইযেইশান, যেটা আসলে ইসলামের কাস্টমাইযেইশান, অগ্রগতি বা প্রগতি না। মুক্তির কোন পথ না। বরং এ পরাজয় সামরিক পরাজয়ের চেয়েও ভয়ংকর।

সংবাদটি শেয়ার করুন:
Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Email this to someonePrint this page

সর্বশেষ সংবাদ

Developed by: