রবিবার, ২২ এপ্রিল ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৯ বৈশাখ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ |
শিরোনাম
ইঞ্জিনিয়ারিং ছেড়ে চা বিক্রি, মাসিক আয় ৫ লাখ!  » «   বড় ঋণগ্রহীতাদের কাছে ব্যাংকের সাড়ে তিন লাখ কোটি টাকা  » «   মসজিদে যাওয়ার সময় ফিলিস্তিনি বিজ্ঞানীকে গুলি করে হত্যা  » «   দিরাইয়ে নির্মাণাধীন দুটি সেতুর দেয়ালে ফাটল  » «   কোপা দেল রে চ্যাম্পিয়ন বার্সা  » «   সেলিমের সাথে বৈঠক: বিভ্রান্তিমূলক তথ্য প্রচারের অভিযোগে ১৩ কাউন্সিলরের নিন্দা  » «   সিলেট সিটি কর্পোরেশনের কোন ওয়ার্ডে কতো ভোটার  » «   কানাইঘাটে ডাকাতি-খুনের ঘটনায় অস্ত্রসহ গ্রেফতার ২  » «   আরও ৪ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করলো ইসরায়েলি হানাদার  » «   ভারতে আট মাস বয়সী শিশুকে ধর্ষণ করলো এক পাষণ্ড  » «   রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতন ও গণহত্যার স্বাধীন তদন্ত চায় কমনওয়েলথ  » «   সিরিয়ায় পশ্চিমা হামলা এবং বিশ্বনেতাদের রহস্যজনক ভূমিকা  » «   বিএসএফ’র হাতে আটক ২ যুবক ভারতের কারাগারে  » «   বহুদিন পর আরব আমিরাতে খুলতে যাচ্ছে বাংলাদেশের শ্রম বাজার  » «   সৌদিতে সিলিন্ডার বিস্ফোরণে দুই সহোদরসহ ৭ বাংলাদেশির মৃত্যু  » «  

ফররুখ আহমদ ও তাঁর শিশু সাহিত্য

শরীফ আবদুল গোফরান :
আচ্ছা, তোমরা কি বলতে পারো, বৃক্ষের পরিচয় কিসে? বৃক্ষের পরিচয় হয় ফলে? বৃক্ষে ফল ধরলে অনায়াসে বলা যায়, এ বৃক্ষটির নাম কি। তেমনি একজন কবির পরিচয় তার কবিতায়। তার ভাবে, বিষয়ে, বিন্যাস। কবি ফররুখ আহমদের পরিচয়ও তার কবিতায়। তার মনোজগৎ, দৃষ্টিকোণ, প্রকাশভঙ্গী সবকিছুর ইঙ্গিতই পাওয়া যায় তাঁর কবিতার ভেতর, মুখের হাসি আর বুকের ভালোবাসাকে মনের রঙে রাঙিয়ে জীবনের আকাশে রঙধনুর মতো এলিয়ে দেয়ার প্রবাসী তিনি। তিনি নতুন কারিগর। প্রচলিত রীতিনীতি পুরনো ছাদ ভেঙে নিজস্ব নিয়মে গড়ে তুলেছেন কবিতার নতুন ইমারত। তাঁর বড়দের কবিতার ক্ষেত্রে এ কথা যেমন সত্য, তেমনি ছোটদের কবিতার ক্ষেত্রেও। তাঁর কবিতার ছন্দে ছন্দে বয়ে গেছে বাংলাদেশের নদী, আর শব্দে শব্দে জড়িয়ে আছে পাখির গানের সুর। যতদিন ফুল ফুটবে, নদী বয়ে যাবে, পাখি গাইবে ততদিন ফররুখ আহমদ হয়ে থাকবেন আমাদের প্রিয়। ছোট বড় সবার প্রিয় মানুষ, প্রিয় কবি। শিশু সাহিত্যে কবি ফররুখ আহমদ এক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব। তার এ অবদান আমাদের জন্য এক বিরাট সম্পদ। তিনি নির্মল মন নিয়ে ভালোবাসেন প্রকৃতিকে। সব কিছুকে নিয়ে লিখেছেন ছড়া-কবিতা। তার মন শিশুদের জন্য গভীর মায়ায় ছলকে ওঠে। ফলে শিশুদের জন্য তার হাত থেকে ঝে পড়ে মজাদার ছড়া, কবিতা, গল্প ও নাটক। কবির প্রথম শিশু-কিশোর কাব্যগ্রন্থ ‘পাখির বাসা’। কবিতাগুলোতে ঘুঘু, বক, পেচা, গাঙশালিক, বাবুই, চড়ুই এর কথা রয়েছে। তিনি পাখির জীবনধারা শিশুদের উপযোগী করে সুন্দর ভাষায় ছন্দে ছন্দে বর্ননা করেছেন। ফলে সবার মন উড়ে যায় বন বাগাড়ে, পুকুর পাড়ে আর বাঁশ ঝাঁড়ের ছত্রে ছত্রে। “পাখির বাসা” গ্রন্থটি পড়লেই বুঝা যায় কবি ফররুখ আহমদের সাথে পাখিদের কেমন সম্পর্ক। ছোট বন্ধুদের সাথেও তো পাখীদের সম্পর্ক একেবারেই কম নয়। বাড়ির আশপাশের ডাল পালাতে পাখীরা যখন উড়াউড়ি করে কিচির মিচির করে ডাকে তখন কার না ভালো লাগে। গ্রামে অনেক শিশুই তো আছে, এক সঙ্গে কয়েক বন্ধু মিলে পাখির বাসা খুঁজতে বের হয়। পাখিদের বাসা বানানোর স্থান গ্রামের শিশুদের জানা। কবি পাখি এবং গ্রামের শিশু-কিশোরদের মনের ভাবছে সুন্দর করে শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে কবিতায় প্রকাশ করেছেন।
যেমন-
“আয় গো তোরা ঝিমিয়ে পড়া দিনটাতে
পাখীর বাসা খুঁজতে যাবো এক সাথে
কোন বাসাটা ঝিঙে মাচায়
ফিঙে থাকে কোন বাসাটায়
কোন বাসাতে দোয়েল ফেলে সাঁজ রাতে।”
কোন কোন পাখিী বাসা বানায় লতাপাতার গাছে। কোনটা বড় গাছের মগডালে, বা গাছের কোটরে। পাখির বিচিত্র রূপ দেখে অনেকেই যেমন আক হয় তেমনি কবিও অবাক হতেন, তিনি তার কবিতায় বলেন-
“মাছ রাঙাটার রঙিন ডানা
কিভাবে সে যায় না জানা
রুদ্দুরে রঙ চমকদিয়ে
চোখ দুটোকে দেয় ধাঁধিয়ে।’
তোমাদেরকে আমি যদি প্রশ্ন করি বলতো দেখি, সকালবেলা কারা ঘুমিয়ে থাকে? তোমরা এক বাক্যে বলবে, অলসেরাই সকালে ঘুমিয়ে থাকে। পাখির কিচির-মিচির ডাক ও প্রকৃতি প্রদত্ত কণ্ঠের গান সব চাইতে মিষ্টি ও মধুর শোনা যায় ভোর বেলাতেই। সে সময় তারা ঘুম ভাঙানীর গানকরে,সবাইকে জাগিয়ে তুলতে চায়। তখন কি ঘুমিয়ে থাকতে মন চায়? না। কবি ফররুখ আহমদও পাখিদের কিচির-মিচির ডাক শুনার পর ঘুমিয়ে থাকতে পারতেন না। তিনি ঘুম থেকে জেগে তাদের এসব গানের অর্থ বোঝার চেষ্টা করতেন- যা পরে তার নিজের ভাষায় প্রকাশ করতেন-
“ফাল্গুনে শুরু হয় গুণগুণানী
ভোবমরাটা গায় গান ঘুম ভাঙানী
এক ঝাঁক পাখী এসে ঐকতানে
গান গায় এক সাথে বোর বিহানে
আজানের সুর মেশে নীল আকাশে
শির শির করে ঘাস হিম বাতাসে।”
ফুল দেখতে কেমন? সুন্দর, তাই না? ফুলকে কে না ভালোবাসে। ফুলের প্রতি ছোট বড় সবারই হৃদয়ের টান রয়েছে। তবে বড়দের তুলনায় ছোটরাই ফুলকে বেশি ভালোবাসে। কবি ফররুখ আহমদ ফুলকে অন্যদের তুলনায় একটু বেশিই ভালোবাসতেন। ফলে ফুলকে নিয়ে তার অনেক লেখা।
আর এসব নিয়েই তার একটি কাব্য গ্রন্থ, নাম ‘ফুলের জলসা’। এতে তিনি ফুলকে নিয়ে হরেক রকম ছড়া লিখেছেন। যেমন-
“ঝুমকো জবা বনের দুল
উঠলো ফুটে বনের ফুল
সবুজ পাতা ঘুমটা খুলে
ঝুমকো জবা হাওয়ায় দোলে
সেই দুলুনির তালে তালে
মন উড়ে যায় ডালে ডালে।”
তিনি আরো লিখেছেন-
গুল মেহেরের ডালে রঙের আগুন লেগেছে
ঘুমন্ত সব ফুলকুঁড়িরা আবার জেগেছে
ঘুম ঘুম ঘুমে যারা ছিল জড়িয়ে
তাদের মনের আগুন এখন যায় যে ছড়িয়ে
পাপড়ি পাতা শিখার মত ভোর বাতাসে দোলে
ফুলের জোয়ার সামনে দেখে খোকা খুখু ভোলে।
শ্রামণ মাসে সারাদিন বৃষ্টি ঝরে। আর তা মনে হয় যেন তালে তালে ঝম ঝম করে বাজনার শব্দ। শ্রাবণের মৃদু ও ভারী বর্ষণ কবির মন কেড়ে নেয়। তিনি লিখেন-
ইলশে গুঁড়ি! ইলশে গুঁড়ি
আসলো উড়ে মেঘের ঘুড়ি।
হাওয়ায় বাজে রেশমী চুড়ি
ইলশে গুঁড়ি! ইলশে গুঁড়ি।
কবি জীবনে সবচেয়ে বেশি আদর ভোগ করেছেন বুড়ো দাদুর। দাদুর কোলে মাথা রেখে তিনি কত গল্পই না শুনতেন। একসময় পক্সক্ষীরাজে চড়ে সাত সমুদ্দু’র তের নদীর পার হয়ে চলে যেতেন হাতেম তাইর দেশে। হারিয়ে যেতেন কল্পনার রাজ্যে। বড় হয়েও দাদুর কথা তাঁর মনে পড়তো। তাঁর অনেক লেখা দাদুর গল্প থেকে। দাদুকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আদায় করা গল্পগুলোকে কবি তার কাব্য সাধনায় কাজে লাগিয়েছেন। তাই তো-
অবাক হলাম দাদুর হাতে
দেখে চুষি কাঠি
ঘোরের তিনি মারবেল আর
নিয়ে দুধের বাটি।
সবাই বলে শেষ বয়সে
আবদারটা চড়া
দাদু বলেন আধা বুড়োরা
কেন পড়ে ছড়া।
ছোটদের জন্য লেখা কবির প্রতিটি ছড়া কবিতাই আন্তরিকতায় ভরপুর। তিনি কতই না উপদেশ দিয়েছেন তাদেরকে। অসত্যের বিরুদ্ধে লড়ে সত্যের পথে অগ্রসর হওয়ার জন্য। তিনি বলেন-
শুনবো না আর পিছন টান
মানবো না আর বান তুফান
ডাকছে খুন রক্তারুণ
ভবিষ্যতের পথ উজ্জ্বল
সামনে চল সামনে চল।
যার বিশাল চোখ দেখে সবাই বিস্মিত হতেন,তিনি কবি হিসেবেও বিশাল ছিলেন, কবি কাজী নজরুল ইসলাম ছাড়া এমন সুন্দর মনের কবি আর জন্মাননি আমাদের ভেতর। যেখানে এসে কবি আর জন্মাননি আমাদের ভেতর। যেখানে এসে কবি নজরুল থমকে দাঁড়ালেন, সেখান থেকেই তার শুরু। হাতে তুলে নিলেন পতাকা। পত পত করে উড়ালেন আকাশে, মুখরিত হয়ে গেলো সমগ্র আকাশ ও পৃথিবী। তাঁর চোখে স্বপ্ন, লেখায় স্বপ্ন, সর্বত্র স্বপ্ন, তিনি স্বপ্ন দেখতেন, স্বপ্ন দেখাতেন; বলতেন সমুদ্রের কথা, সমুদ্র পাড়ি দিয়ে বহু দূর যাবার কথা। সিন্দাবাদ, নৌফেল, হাতেম, শাহের কাদী, ইয়াসমিনকে খুঁজে বের করেন তিনি। এরা তাঁর কাছে একরাশ স্বপ্ন হয়ে দেখা দিয়েছিল। সে সব পড়ে আমরাও স্বাপ্নিক হয়ে উঠি। তাঁর কবিতায় নীল সমুদ্রের গর্জন, অচেনা বন্দর, লবংগ দ্বীপ, সবুজ পাতার নারঙ্গী বন, নোনা জলের জোয়ার, পাল তোলা জাহাজের যাত্রা- আমাদের ভাসিয়ে নিয়ে যায়, ব্যাকুল করে তোলে।
কবি ফররুখ আহমদ ছোট বড় সবার কবি। তাঁর লেখা শিশু-কিশোরদের জন্য বইগুলো হলো- পাখির বাসা, হরফের ছড়া, চিড়িয়াখানা, ফুলের ছড়া, সাঁঝ সকালের কিসসা, ছড়ার আসর, পোকা মাকড়, পাগলা ইঞ্জিন, দাদুর কিসসা, পাখির ছড়া, আলোক লতা, খুশির ছড়া, মজার ছড়া, নতুন লেখা, রং মশালও নয়া জামাত।
১৮১৮ সালের ১০ই জুন যশোরের মাঝআউলে কবি ফররুখ আহমদ জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম সৈয়দ হাতেম আরী, আর মাতার নাম বেগম রওশন আখতার। সৈয়দ হাতেম আলী ছিলেন একজন প্রতাপশালী পুলিশ ইন্সপেক্টর।
১৯৭৪ সালের ১৯ অক্টোবর কবি ফররুখ আহমদ ইন্তেকাল করেন, রমযান মাসে যে মানুষটির জন্ম হয়েছিল আবার আবার এক রমযান মাসেই তিনি বিদায় নিয়েছেন অন্য জগতে।
কবি ফররুখ আহমদ ছিলেন দৃঢ় চরিত্রের আদর্শ মানুষ। আবার হৃদয়বানও। মানুষকে গভীরভাবে ভাল বাসতেন তিনি। ফলে ইতিহাসে তিনি একজন বড় মানুষ হিসাবেই স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। স্মরণীয় হয়ে থাকবেন লাখ লাখ শিশু-কিশোরের হৃদয়ের মণিকোঠায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন:
Share on Facebook1Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Email this to someonePrint this page

সর্বশেষ সংবাদ

Developed by: