মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ১০ আশ্বিন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ |
শিরোনাম
সিম রেজিস্ট্রেশনে আর কাগজ-কলম লাগবে না  » «   টাইফুন ‘জেবি’র আঘাতে লণ্ডভণ্ড জাপান, নিহত ৯  » «   রোনালদোর বেতন তিন গুণ বেশি!  » «   দ্বিতীয়বার সিলেটের মেয়র হিসেবে শপথ নিলেন আরিফ  » «   যে নামগুলো পাসওয়ার্ড হিসেবে ব্যবহার করবেন না  » «   ট্রাম্পের ‘প্যান্ট’ খুলে দিল যে বই  » «   নিরাপদ সড়ক আন্দোলন: ঘটনাই ঘটেনি, মামলা করে রেখেছে পুলিশ  » «   ‘অ্যাওয়ে গোল’ বাতিল করো, দাবি মরিনহো-ওয়েঙ্গারদের  » «   শহিদুলকে প্রথম শ্রেণির বন্দীর সুবিধা দিতে নির্দেশ  » «   আরপিও সংশোধন নিয়ে নির্বিকার নির্বাচন কমিশন  » «   মাহাথিরের রসিকতায় শ্রোতাদের মধ্যে হাসির রোল!  » «   দেশের বাইরে রান করাটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখি : মুশফিক  » «   দুর্দান্ত জয়ে সিপিএলের শীর্ষে মাহমুদুল্লাহরা  » «   খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবিতে বিএনপির ২ দিনের কর্মসূচি  » «   আদালতকে খালেদা জিয়া : ‘আমার অবস্থা খুবই খারাপ’  » «  

আকাশ সংস্কৃতির আগ্রাসন এবং বাংলাভাষার অস্তিত্ব রক্ষা

হাসান হাসনাইনঃ
পৃথিবী ও সভ্যতার ইতিহাস পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, হাজার হাজার ভাষা ইতোমধ্যে বিলুপ্তের খাতায় নাম লিখিয়েছে। আবার স্কটল্যান্ডের অতি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর অখ্যাত ভাষা ইংরেজি রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বর্তমানে আর্ন্তজাতিক ভাষার আসন দখল করেছে। অন্যদিকে, যে বাংলা ভাষা পৃথিবীর একক বৃহত্তম ভাষা হওয়ার কথা ছিল, সেই ভাষাকে পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন করার ষড়যন্ত্র রুখে দিয়েছিল আমাদের পূর্বপুরুষেরা-তাদের মেধা দিয়ে, রক্ত দিয়ে, সংগ্রাম দিয়ে। মহান একুশ-এর চেতনাকে শাণিত করে বাংলা ভাষাকে এবং বাংলাদেশের অগ্রগতিকে ষড়যন্ত্রের হাত হতে রক্ষায় নতুন প্রজন্মকে আঁকড়ে ধরতে হবে নিজের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতিকে। আজকের লেখায় আমরা বাংলা ভাষাকে ধ্বংসের অতীত প্রয়াশের কথা যেমন তুলে ধরতে চাই, তেমনি বর্তমানেও বাংলা ভাষাকে বিকৃত করার যে বহুমাত্রিক প্রয়াশ চলছে তা চিহ্নিত করতে চাই।
বৃটিশশাসিত ভারতবর্ষ ছিল বহু ভাষাভাষি মানুষের দেশ। কোন কোন গবেষকের দাবি অবিভক্ত ভারতে হাজার এরও বেশি ভাষার অস্তিত্ব ছিল, যার অনেক গুলো বর্তমানে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। ১৯৪৭ খ্রি. এর ১৪ আগষ্ট ও ১৫ আগষ্ট যথাক্রমে পাকিস্তান ও ভারত ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে অনেকগুলো অমীমাংসিত বিষয়কে সামনে রেখে। ঐ সব অমীমাংসিত বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল ভাষা। ভারতের রাষ্ট্র ভাষা কি হবে? পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা কি হবে? অবিভক্ত ভারতে একক বৃহত্তম ভাষা ছিল বাংলা। বিভক্ত ভারতেও বাংলা ছিল বৃহত্তম ভাষা। সঙ্গত কারণেই সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত উভই রাষ্ট্রে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উত্থাপিত হয়। শুধু দাবি নয়, যৌক্তিক এবং জোড়ালো দাবি। কিন্তু শুরু হল বাংলা ভাষার ভাগ্য বিপর্যয়ের ইতিহাস। স্বাধীন ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা ব্যারিস্টার জওয়াহেরলাল নেহেরু ভারতের রাষ্ট্র ভাষা প্রশ্নে প্রথমে কংগ্রেস নেতৃত্বকে এবং পরে প্রভাবশালী বাঙালী বুদ্ধিজীবীদেরকে তাঁর অবস্থানের পক্ষে আনতে সক্ষম হন। বহু-ধর্ম-বর্ণ-ভাষা-গোত্রের দেশ ভারতের রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করা হয় অতি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠির ভাষা ‘হিন্দি’ এবং বৃটিশ উপনিবেশিক শক্তির ভাষা ইংরেজিকে যুগপৎভাবে। অর্থাৎ ভারতের রাষ্ট্র ভাষা হল হিন্দি ও ইংরেজি ভাষা। এভাবে অবসান ঘটল পৃথিবীর এক নাম্বার বা একক বৃহত্তম ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা।
অতঃপর বাংলার দুর্ভাগ্যের দ্বিতীয় পর্বে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ উদ্যত হলেন বাংলা ভাষাকে পৃথিবী থেকে বিদায় দিতে। মি. জিন্নাহ কারো সাথে আলোচনার তোয়াক্কা না করে, এক রহস্যময় সিদ্ধান্তে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে ঘোষণা করে বসেন। এখানেও লক্ষ্যণীয় এবং মজার বিষয় হলো, সমগ্র পাকিস্তানের (পূর্ব ও পশ্চিম) মাত্র ০.৫৬ (শূন্য দশমিক ছাপান্ন) শতাংশের ভাষা ছিল উর্দু। যাদের অধিকাংশই ভারতের এলাহাবাদ থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে এসে বসবাস শুরু করে। আরো লক্ষ্যণীয় যে, মি. জিন্নাহ নিজেও ভালোভাবে উর্দু বলতে পারতেন না, লিখতে বা পড়তে পারতেন না। মি. জিন্নাহর এই রহস্যময় সিদ্ধান্ত তাঁর তাবেদার নেতা-কর্মীরা মেনে নিলেও সমগ্র পাকিস্তানের ৫৬% (ছাপান্ন) শতাংশ বাংলা ভাষাভাষী জনগণ, ছাত্র, বুদ্ধিজীবী কেউ মেনে নিতে পারেনি। তারা মি. জিন্নাহ সামনেই ‘নো’ ‘নো’ বলে প্রতিবাদ করেন, কলম ধরেন, সভাসমাবেশ করেন। ১৯৪৯ খ্রি. মি. জিন্নাহ মৃত্যুবরণ করলেও তাঁর অন্ধ অনুসারীরা উর্দুকে প্রতিষ্ঠার বহুরকম চেষ্টা চালিয়ে যান।
তাদের সে চেষ্টা সফল হলে এতদিনে হয়ত বাংলা ভাষা পৃথিবীর হাজার হাজার বিলুপ্ত ভাষার তালিকায় স্থান করে নিত। কিন্তু আমাদের গর্বিত ও দৃঢ়চেতা পূর্বপুরুষেরা তাঁদের বহু কষ্ট, নির্যাতন এবং প্রাণ বিসর্জনের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষাকে রক্ষা করেছেন। পাকিস্তানি স্বৈরশাসকরা বাংলাভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকার করে নিতে বাধ্য হয়েছে। ১৯৫২ খ্রি. ২১ ফেব্রুয়ারির সে মহান আত্মত্যাগকে ধারণ করে বাংলা ভাষাভাষীরা শুধু তাদের ভাষা রক্ষা করে নি, অর্জন করে নিয়েছে তাদের নিজেদের জন্য স্বাধীন-সার্বভৌম একটি রাষ্ট্র। গর্বিত পূর্বপুরুষদের রক্তের ধারাবাহিকতায় আমাদের নতুন প্রজন্ম ১৯৯৯ খ্রি. জাতিসংঘ থেকে ‘২১ ফেব্রুয়ারিকে “আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবস” হিসেবে উদ্যাপনের স্থায়ী ব্যবস্থা করে নিতে সক্ষম হয়েছেন।
আশা করা হচ্ছে সে ধারাবাহিকতায় বর্তমান বিশ্বের প্রায় ৩৫ কোটি মানুষের মুখের ভাষা বাংলা অচিরেই জাতিসংঘের অন্যতম অফিসিয়াল (দাপ্তরিক) ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পাবে।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাভাষার বিরুদ্ধে যে আত্মঘাতী তৎপরতা চলছে তার ব্যাপারে নতুন প্রজন্মকে সজাগ করতে সরকার, প্রশাসন, বুদ্ধিজীবী সকলকেই এগিয়ে আসতে হবে। বিশেষ করে সংস্কৃতিকর্মী, সংবাদকর্মী ও সুশীলসমাজকে উদ্যোগী হতে হবে। বাংলাভাষার বিরুদ্ধে পরিচালিত বর্তমান অপতৎপরতা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কোন কোন মহল ইংরেজি চর্চার নামে এক ধরনের ‘বাংলিশ’ চর্চা করে বাংলা ভাষাকে খাটো করার এবং বিকৃত করার অপপ্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে দেশে প্রচলিত এফ.এম রেডিও এবং কিছু টিভি উপস্থাপক এই বিকৃত চর্চাকে তরুণদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে তৎপর রয়েছে।
বাংলাভাষাকে বিশ্বায়নের প্রতিযোগিতায় ‘আকাশ সংস্কৃতির’ সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এগুতে হবে। বিদেশী বিভিন্ন চ্যানেল চটকদার অনুষ্ঠানমালা অবাধে এদেশে প্রচারিত হচ্ছে এবং তরুণ-তরুণীদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। ফলে এদেশের ভাষা ও সংস্কৃতি ভাষা বৈকল্য ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের কবলে পড়ছে। এদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক অনুষ্ঠানের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, আগে যেখানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে দেশাত্মবোধক গান, রবীন্দ্র সংগীত, নজরুল সংগীত, আধুনিক গান, লোকগীতি ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীদের অংশগ্রহণে পরিবেশিত হত। কিন্তু এখন এক ধরণের বিকৃত রুচির কবলে পড়ে শিক্ষার্থীরা দেশীয় সংস্কৃতির পরিবর্তে ডি জ পার্টির নামে ভিন্ন ভাষার উগ্র গান বাজনা বাজিয়ে পাশ্চাত্য ঢংয়ে নাচ করে সাংস্কৃতিক কর্মসূচী পালন করছে। ফলে, ধ্বংসের কবলে পড়ছে বাংলাভাষা ও সংস্কৃতি।
আসুন, একুশকে গতানুগতিকভাবে পালন না করে, আত্মমূল্যায়নের মাধ্যমে মাথাউঁচু করে বাংলাভাষাকে বিশ্বময় ছড়িয়ে দেওয়ার অঙ্গীকার নিয়ে পালন করি। পরিশেষে ভাষার জন্য যাঁরা জীবন বিসর্জন দিয়েছেন, ত্যাগ স্বীকার করেছেন তাঁদের সকেেলর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে শেষ করছি।

সংবাদটি শেয়ার করুন:
Share on Facebook
Facebook
0Share on Google+
Google+
0Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin
Email this to someone
email
Print this page
Print

সর্বশেষ সংবাদ

Developed by: