সোমবার, ১৫ অক্টোবর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৩০ আশ্বিন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ |
শিরোনাম
আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নিলেন আরিফুল হক চৌধুরী  » «   সিম রেজিস্ট্রেশনে আর কাগজ-কলম লাগবে না  » «   টাইফুন ‘জেবি’র আঘাতে লণ্ডভণ্ড জাপান, নিহত ৯  » «   রোনালদোর বেতন তিন গুণ বেশি!  » «   দ্বিতীয়বার সিলেটের মেয়র হিসেবে শপথ নিলেন আরিফ  » «   যে নামগুলো পাসওয়ার্ড হিসেবে ব্যবহার করবেন না  » «   ট্রাম্পের ‘প্যান্ট’ খুলে দিল যে বই  » «   নিরাপদ সড়ক আন্দোলন: ঘটনাই ঘটেনি, মামলা করে রেখেছে পুলিশ  » «   ‘অ্যাওয়ে গোল’ বাতিল করো, দাবি মরিনহো-ওয়েঙ্গারদের  » «   শহিদুলকে প্রথম শ্রেণির বন্দীর সুবিধা দিতে নির্দেশ  » «   আরপিও সংশোধন নিয়ে নির্বিকার নির্বাচন কমিশন  » «   মাহাথিরের রসিকতায় শ্রোতাদের মধ্যে হাসির রোল!  » «   দেশের বাইরে রান করাটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখি : মুশফিক  » «   দুর্দান্ত জয়ে সিপিএলের শীর্ষে মাহমুদুল্লাহরা  » «   খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবিতে বিএনপির ২ দিনের কর্মসূচি  » «  

এক কিংবদন্তির গল্প

জাকারিয়া মাসুদঃ
শুনো, এক কিংবদন্তির গল্প বলি। নাম তাঁর মুসআব। বাবার নাম উমাইর। মাতা খুনাস বিনতু মালিক। মক্কার এক অভিজাত পরিবারে যার জন্ম। বাবা একজন বিত্তশালী। বড় ব্যবসায়ী। মক্কায় তার বিশাল ব্যবসা। পিতামাতার পরম আদরের সন্তান মুসআব। নয়নের মণি। ছোটবেলা থেকেই একেবারে নন্দগোপালের মতো করে বেড়ে উঠেছেন। দুঃখ-ক্লেশ, দারিদ্রতা, না পাওয়ার বেদনা, তাকে স্পর্শ করেনি কখনোই। বিত্তশালী বাবার আদরের সন্তান বলে—যা চেয়েছেন, পেয়েছেন তার ঢের বেশি।
মুসআবের বাবা তাঁর জন্যে এমন পোশাকের অর্ডার দিতেন, যা মক্কার মধ্যে অপ্রতুল ছিলো। নামিদামি ব্র্যান্ডের আতর ব্যবহার করতেন তিনি। এমন আতর ব্যবহার করতেন যে, তিনি কোনো পথ দিয়ে গেলে—মানুষজন তা আন্দাজ করতে পারতো। মানুষ বুঝতো, এই আতর মুসআব ছাড়া অন্য কারও নয়। তাঁর চালচলন, পোশাক-পরিচ্ছদ, কথা-বার্তায়, আভিজাত্যের ছাপ ছিলো।
যদিও তিনি ছিলেন যুবক, তবুও মক্কার বড়োবড়ো নেতাদের সমাবেশে—তাঁর স্থান হতো। কুরাইশদের এই আদরের দুলাল, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ন কাজেও নিজের মতামত তুলে ধরতেন। মেধা, প্রজ্ঞা, অভিজাত ব্যক্তিত্বের কারণে—কুরাইশদের প্রিয়পাত্র হয়ে উঠেছিলেন তিনি। অসাধারণ বাগ্মিতা ছিলো তাঁর। ব্যক্তিত্ব ছিলো চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়ার মতো। এই অসাধারণ ব্যক্তিত্বই তাকে সত্যের পথের পথিক হতে উদ্বুদ্ধ করে।
কুরাইশদের কাছে শুনতে পেলেন মুহাম্মাদ (সা) এর কথা। মুহাম্মাদ (সা) নাকি নতুন দীন প্রচার করা শুরু করেছে! আর মক্কার মানুষগুলো সে দীনের দিকে আকৃষ্ট হচ্ছে। প্রতিনিয়ত মুহাম্মাদের (সা) অনুসারীর সংখ্যা বেড়েই যাচ্ছে। কুরাইশদের শত অত্যাচারের মুখেও, মুহাম্মাদের (সা) অনুসারীরা মাথা নত করছে না। মুহাম্মাদের (সা) আনীত দীন ছেড়ে দিচ্ছে না। যত অত্যাচার করা হচ্ছে, তাদের ইমান আরও মজবুত হচ্ছে।
এসব কথা শুনার পর তিনি ভাবতে লাগলেন—কী করা যায়? কেনো মানুষ মুহাম্মাদের (সা) দিকে এতটা ঝুঁকে পড়ছে? মানুষজন তাঁকে যাদুকর বলছে। আবার কেউ-কেউ বলছে মুহাম্মাদকে (সা) জীনে ধরেছে। আসল ব্যাপারটা কী? তাঁর মনের মধ্যে এই চিন্তাগুলো ঘুরপাক খেতে লাগলো। সিদ্ধান্ত নিলেন সরাসরি মুহাম্মাদের (সা) সাথে দেখা করবেন।
খোঁজ নিয়ে জানলেন, মুহাম্মাদ (সা) ও তাঁর সাথিরা আকরামের বাড়িতে জড়ো হন। সাফা পাহাড়ের পাদদেশে আকরামের বাড়ি। সব দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে, একদিন সন্ধ্যেবেলায় আকরামের বাড়িতে হাজির হলেন। তিনি পৌঁছে দেখলেন, মুহাম্মাদ (সা) ও তাঁর সাথীরা সেখানে বসা। তিনিও সেখানে বসে গেলেন। মনোযোগ দিয়ে মুহাম্মাদের (সা) কথা শ্রবণ করতে লাগলেন। ইতোমধ্যে জিবরাঈল এলেন। ওহী নিয়ে।
মুহাম্মাদের (সা) ওপর যেসব আয়াত নাযিল হলো, তিনি সেগুলো হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করার চেষ্টা করলেন। এক অন্যরকম শিহরণবোধ করতে লাগলেন। হাত পা অদ্ভুতরকমভাবে কাঁপতে লাগলো। অন্তরে ঝড় বয়ে যেতে থাকলো। কুরআন কারীমের আয়াতগুলো তাঁকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করতে লাগলো।
সেই সন্ধ্যায়, তিনিও হয়ে গেলেন—বিশুদ্ধ হৃদয়ের অধিকারীদের একজন। তাঁর চোখেমুখে পরিবর্তনের চিহ্ন ফুটে উঠলো। মুহাম্মাদ (সা) তাঁর দিকে তাকালেন। পবিত্র হাত বাড়িয়ে দিলেন। মুসআবের বুকের ওপর সে হাতের স্পর্শ অনুভূত হলো। প্রশান্তি অনুভব করলেন মুসআব। মুহুর্তের মধ্যে বহুগুণ হিকমাহ ও জ্ঞানলাভ করলেন। অন্তরের কালো দাগগুলো দূরীভূত হয়ে গেলো। ইমান তাঁর অন্তরে দৃঢ়তর হলো। এমনই দৃঢ়তা লাভ করলো যে, শত বাঁধার পাহাড়ও তাঁকে বিন্দুপরিমাণ টলাতে পারলো না।
মুসআব তাঁর মাকে খুব ভয় করতেন। তাঁর মা ছিলেন অভিজাত ব্যক্তিত্বের অধিকারিণী। তাই মুসআব তাকে ভয় করতেন। তিনি তাঁর ইসলাম গ্রহণের খবরটি লুকিয়ে রাখলেন। মায়ের সামনে প্রকাশ করলেন না। গোপনে গোপনে রাসূলের (সা) মজলিসে যেতে লাগলেন। দারুল আরকামেও যাতায়াত করতে লাগলেন।
একদিন তিনি দারুল আরকামে প্রবেশ করছিলেন, এমন সময় উসমান ইবনু তালহা তাঁকে দেখে ফেললেন। আরেকদিন তিনি যখন রাসূলের মতো সালাত আদায় করছিলেন, সেদিনও উসমান ইবনু তালহা তাঁকে দেখে ফেলেন। ফলে তাঁর ইসলাম গ্রহণের খবরটি প্রকাশিত হয়ে যায়। বাতাসের বেগে সে খবর ছড়িয়ে পড়ে। মক্কার অলিতে গলিতে। তাঁর মা’র কাছেও পৌঁছায়।
তাঁর ইসলাম গ্রহণের খবর মক্কার মুশরিকদের যারপরনাই বিস্মিত করে। তারা কোনোভাবেই এ বিষয়টা মেনে নিতে পারছিলো না। মুসআবের মতো প্রিন্স, কীভাবে মুহাম্মাদের (সা) ওপর ইমান আনতে পারে? কীভাবে দরিদ্রদের সাথে মুহাম্মাদের (সা) মজলিসে বসতে পারে? মুসআবের মতো প্রজ্ঞাবান যুবকের ওপরেও কী মুহাম্মাদ (সা) জাদু করলো?
মুসআবকে মক্কার মুশরিক নেতাদের সামনে হাজির করা হলো। তাঁর মা-কেও ডেকে আনা হলো। উপদেশ পর্ব শুরু হলো। সবাই মিলে তাঁকে বুঝাতে লাগলো, যাতে মুসআব ইমান ত্যাগ করে। কিন্তু মুসআব একটুও বিচলিত হলেন না। শান্তভাবে তাঁদের কথা শুনলেন। এরপর তাদেরকে কোরআনের অমিয় বাণী শুনাতে লাগলেন। তাঁর মুখে কুরআন তিলাওয়াত শুনে, তাঁর মা রাগান্বিত হলেন। গালে কষে একটা থাপপড় বসিয়ে দিলেন। বকঝকা করলেন। প্রহার করলেন। কিন্তু মুসআব চুপকরে তাঁর মায়ের রূঢ় আচরণ সহ্য করলেন। মা-কে কিছুই বললেন না।
সেদিন যখন বাড়ি ফিরে এলেন, তখন তাঁর মা তাঁকে ঘরে আবদ্ধ করে রাখলেন। একজন পাহারাদার রেখে দেওয়া হলো, তাঁকে পাহারা দেওয়ার জন্যে। কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে প্রিন্স মুসআবকে বন্দী করে রাখা হলো। অত্যাচার চালানো হলো। আর বারবার ইমান ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলো। কিন্তু মুসআব এক চুলও নড়লেন না। সৃষ্টির ভয়, তাঁকে স্রষ্টার ইমান থেকে ফেরাতে পারলো না।
শাইখুল ইসলাম (রহঃ) বলেছেন, ‘সৃষ্টিকে কেবল সে-ই ভয় করতে পারে, যার অন্তরে রোগ আছে।’ মুসআবের অন্তর ছিলো পবিত্র। কলুষতা মুক্ত অন্তর। তাহলে সে অন্তর কীভাবে সৃষ্টির অত্যাচারে ভীত হতে পারে? তাইতো অত্যাচারের পর অত্যাচারও তাঁকে টলাতে পারলো না। বরং তাঁর ইমান আরও দৃঢ়তর হলো। মজবুত হলো।
একদিন তিনি সবার চোখে ধুলো দিয়ে, বাড়ি থেকে পালিয়ে গেলেন। হাবশায় হিজরত করলেন। কিন্তু তাঁর মন মক্কায় রয়ে গেলো। প্রিয় মানুষটিকে তিনি মক্কায় রেখে এসেছেন। যার জন্যে তিনি বাড়িঘর ছেড়েছেন, তাঁকে দূরে রেখে তিনি কীভাবে আনন্দে থাকতে পারেন? তাইতো আবার মক্কায় ফিরে এলেন। ফিরে এলেন রাসূলুল্লাহর (সা) কাছে।
হাবশা থেকে ফিরে আসার পর তাঁর মা তাঁকে আবার বন্দী করতে চাইলেন। নির্ভীক মুসআব এবার কসম খেলেন। কসম খেয়ে বললেন, ‘মা! যদি তুমি এমনটি করো এবং কেউ যদি তোমাকে এ কাজে সাহায্য করে, তাহলে আমি সবাইকে হত্যা করবো।’
ছেলের মুখে একথা শুনে মা ভীত হলেন। মা জানতেন, মুসআব অনেক জেদি। যেহেতু কসম কেটেছে, তাই তাঁকে আর ফেরানো সম্ভব হবে না। কিন্তু মুসআবকে তিনি অনেক ভালোবাসতেন। তাই বারবার তাঁকে ইমান ছেড়ে দেওয়ার জন্যে অনুরোধ করলেন। মুসআব কিছুতেই রাজি হলেন না। মানুষের ভালোবাসা কখনোই আল্লাহর ভালোবাসার ওপর প্রাধান্য পেতে পারে না। তাইতো মুসআব তাঁর মায়ের ভালোবাসার ওপরে আল্লাহর ভালোবাসাকে প্রাধান্য দিলেন। ইমানের ওপর অটল রইলেন।
তাঁর মা তাঁকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিলেন। বিদায় বেলায় মা-ও কাঁদলেন, মুসআবও কাঁদলেন। কিন্তু দুজনেই তাঁদের নিজেদের দীনের ওপর অটল রইলেন। মুসআবও ইসলাম ছেড়ে দিলেন না, আর তাঁর মা-ও কুফর ত্যাগ করলেন না। এক সময়কার প্রিন্স মুসআব, এক কাপড়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে এলেন। বিলাসী মুসআবের গায়ে রেশমি কাপড়ের বদলে, চটের মতো মোটা কাপড় স্থান পেলো।
একদিন আল্লাহর রাসূল (সা) তাঁর সাহাবাদের সাথে বসা। মুসআবও তাঁদের সাথে বসা। মুসআবকে দেখে সকলের মধ্যে ভাবান্তর হলো। দৃষ্টি নত হলো। কারও কারও চোখে পানি চলে এল।
কেনো, জানতে চাও?
কারণ, মুসআব যে কাপড়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে এসেছিলেন, এখনও সেই কাপড়টিই তাঁর গায়ে। ময়লা জমে গেছে কাপড়ে। ছিঁড়ে গেছে বহু জায়গায়। ছেঁড়া জায়গাগুলোতে চামড়ার তালি লাগানো। দরিদ্রতার ছাপ স্পষ্ট। সাহাবাদের চোখে মুসআবের ইসলাম পূর্ব জীবনের ছবি ভেসে উঠলো। এই কি সেই মুসআব, যিনি দামি কাপড় ছাড়া বাইরে বের হননি কোনোদিন? এই কি সেই মুসআব, যার আতরের ঘ্রাণ নারীদের হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দিত বহুগুন?
সাহাবাদের চোখ অশ্রু সজল হলো। রাসূল (সা) বললেন, ‘মক্কায় মুসআবের চেয়ে সুদর্শন ও উৎকৃষ্ট পোশাকধারী আর কেউ ছিল না। তাঁর চেয়ে পিতামাতার বেশি আদরের আর কোনও যুবকও ছিলো না। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ভালোবাসায়, যে (মুসআব) সবকিছু ত্যাগ করেছে।’
কিছুদিন পরের ঘটনা। তখন হজের মৌসুম। মদীনা থেকে কিছু লোক এলো। এসে রাসূলের (সা) সাথে সাক্ষাৎ করলো। রাসূলের (সা) ওপর ইমান আনলো। রাসূলের (সা) হাতে বায়াত হলো। এরপর মদীনায় ফিরে গেলো। আল্লাহর রাসূল (সা) মদীনার মুসলিমদের দীন শিক্ষা দেওয়ার জন্যে কাউকে পাঠানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেন। তিনি মুসআবকে মদীনায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন।
এভাবে মুসআব ইসলামী ইতিহাসের প্রথম দূত হিসেবে মনোনীত হলেন। মক্কায় মুসআবের চেয়ে বয়সে বড়ো অনেক সাহাবা ছিলেন। কিন্তু তবুও রাসূল (সা) মুসআবকেই ইসলামের দূত হিসেবে মনোনীত করলেন। তাঁর বাগ্মীতা, মেধা, উত্তম চরিত্র, দীনের জন্যে তাঁর কুরবানি, রাসূলকে (সা) মুগ্ধ করেছিলো। তাই অন্য কোনও সাহাবার বদলে রাসূল (সা) তাকেই মদীনায় পাঠালেন।
মুসআব মদীনায় ইসলামের শিক্ষা দিতে লাগলেন। নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করতে লাগলেন। তাঁর দাওয়াতে মদীনার বনী আবদিল আশহালের নেতা উসাইদ সহ অনেক বড়োবড়ো নেতারা মুসলিম হলো।
সময় দ্রুত গতিতে বয়ে চললো। ইতোমধ্যেই রাসূল (সা) মদীনায় হিজরত করেছেন। মদীনায় ইসলামিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। মক্কার মুশরিকদের অত্যাচার থেকে মুসলিমরা কিছুটা স্বস্তি পেয়েছে। কিন্তু মদীনার মুসলিমদের দেখে কুরাইশরা রাগে-ক্ষোভে জ্বলতে লাগলো। হিংসা তাদের অন্তরে বাসা বাধলো। মদীনা থেকে ইসলামের নিশানা মিটিয়ে দিতে তারা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো।
বদরের যুদ্ধ হলো। মুসলিমদের ধ্বংস করবে তো দূরের কথা; কুরাইশরা এমন নাকচুবোনি খেলো যে, কোনোরকমে জীবন নিয়ে পালালো। কিন্তু কিছুদিন না যেতেই, তারা আবার ফন্দি আঁটলো। যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে হাজির হলো উহুদের ময়দানে ।
মুসলিম বাহিনী ও কুরাইশ বাহিনী যুদ্ধের জন্যে মুখোমুখি হলো। যুদ্ধ শুরুর পূর্বে রাসূল (সা) কার হাতে ইসলামের পতাকা তুলে দেবেন, এই নিয়ে ভাবতে লাগলেন। তিনি সাহাবাদের দিকে তাকাতে লাগলেন, কাকে এই পতাকা তুলে দেওয়া যায়? রাসূল (সা) গভীরভাবে নিরীক্ষণ করলেন। তাঁর দৃষ্টি মুসআবের দিকে নিবদ্ধ হলো। তিনি মুসআবকে ডাকলেন। মুসআব এলেন। রাসূল (সা) তাঁর হাতে ইসলামের পতাকা তুলে দিলেন।
তুমুল যুদ্ধ শুরু হলো। কুরাইশরা একেবারে কোণঠাসা হয়ে গেলো। কুরাইশ বাহিনী পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছুলো। কিন্তু ছোট্ট একটি ভুলের কারণে, কুরাইশরা মুসলিমদের ওপর তুমুল আক্রমণ শুরু করলো। কুরাইশরা মুসলিমদের ধাওয়া করলো। মুসলিম বাহিনী বিশৃঙ্খল হয়ে পড়লো। এই সুযোগে কুরাইশরা আল্লাহর রাসূলের (সা) ওপর আক্রমণ করলো।
প্রিন্স মুসআব বিপদের তীব্রতা অনুভব করলেন। ঝাণ্ডা উঁচু করে ধরলেন। উঁচু স্বরে তাকবীর দিতে লাগলেন। রাসূলকে (সা) নিরাপত্তা দেওয়ার জন্যে হাতে তলোয়ার তুলে নিলেন। এক হাতে ঝাণ্ডা, আরেক হাতে তলোয়ার নিয়ে শত্রুবাহিনীর মধ্যে ঢুকে গেলেন। আল্লাহু আকবার ধ্বনিতে আকাশ বাতাস কাপিয়ে তুললেন। বীরের মতো যুদ্ধ করে যেতে লাগলেন, রাসূলের (সা) সুরক্ষার জন্যে। মুসআব শুধু মুসআব রইলেন না, একজন মুসআব—একটি সেনাবাহিনীতে পরিণত হলেন। বীরদর্পে যুদ্ধ করে যেতে লাগলেন।
তিনি দেখতে পেলেন শত্রুরা রাসূলের (সা) খুব নিকটে চলে এসেছে। তিনি রাসূলের (সা) নিকটে পৌঁছুলেন। নিজের শরীরকে রাসূলের (সা) জন্যে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করলেন। ইবনু কামীয়ার আঘাতে তাঁর ডান হাত দেহ দেখে বিচ্ছিন্ন হলো। সাথে সাথে বাম হাতে ঝাণ্ডা নিলেন। তিনি আবৃত্তি করলে লাগলেন—‘ওয়ামা মুহাম্মাদুন ইল্লা রসূল, ক্বদ খলাত মিং ক্ববলিহির রসূল’। কিছুক্ষণ পর তাঁর বাম হাতটি দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হলো। কর্তিত বাহু দ্বারা ইসলামের ঝাণ্ডা তুলে ধরলেন। আর পড়তে লাগলেন—‘ওয়ামা মুহাম্মাদুন ইল্লা রসূল, ক্বদ খলাত মিং ক্ববলিহির রসূল’।
এরপর তাঁকে লক্ষ করে বর্শা নিক্ষেপ করা হলো। বর্শা এফোঁড়-ওফোঁড় করে বেরিয়ে গেলো। বীরের মতো মুসআব এই দুনিয়া থেকে বিদেয় নিলেন। শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত লড়াই করলেন। জীবিত থাকা পর্যন্ত রাসূলকে (সা) সুরক্ষা দিলেন। (আল্লাহ মুসআবের প্রতি সন্তুষ্ট, মুসআবও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট)।
যুদ্ধ শেষ হলো। শহীদদের লাশগুলো একসাথে জড়ো করা হলো। মুসআবের লাশটি আনা হলো। রক্ত আর ধূলোবালিতে তাঁর চেহারা একাকার। সাহাবারা কাঁদতে লাগললেন। রাসূলও (সা) কাঁদলেন। অঝোর কান্না। খাব্বাব বলে উঠলেন—‘আমরা আল্লাহর রাস্তায় হিজরত করেছিলাম আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে। রাসূল (সা) এর সাথে। আমাদের এ কাজের প্রতিদান দেওয়া আল্লাহর দায়িত্ব। আমাদের মধ্যে যারা এ কাজের প্রতিদান মোটেও না নিয়ে দুনিয়া থেকে বিদেয় নিয়েছে, মুসআব তাঁদেরই একজন।’
মুসআবকে কাফন দেওয়ার জন্যে চাদর আনা হলো। একপ্রস্থ চাদর। এ ছাড়া আর কিছুই পাওয়া গেলো না। যখন মুসআবকে সেই চাদরে ঢাকা হচ্ছিলো, তখন মাথা ঢাকলে পা আর পা ঢাকলে মাথা বেরিয়ে যাচ্ছিলো। শেষমেশ রাসূল (সা) বললেন, ‘চাদর দিয়ে মাথার দিক যতটুকুন ঢাকা যায়, ঢেকে দাও। পায়ের দিকে ইযখীর ঘাস দাও।’
সাহাবারা রাসূলের (সা) কথার অনুসরণ করলেন। মক্কার প্রিন্স নিঃস্ব অবস্থায়, এ দুনিয়া থেকে বিদেয় নিলেন। রাসূল (সা) মুসআবের কাছে দাঁড়িয়ে কোরআন কারীমের একটি আয়াত পাঠ করলেন। মুসআবকে উদ্দেশ্য করে। রাসূল (সা) পড়লেন—‘মুমিনদের মধ্যে এমন কিছু লোক আছে, যারা আল্লাহর সাথে কৃত অজ্ঞীকার সত্যে পরিণত করেছে।’ [সূরা আহযাব, ২৩ আয়াত]
রাসূল (সা) মুসআবের কাফনের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আমি তোমাকে মক্কায় দেখেছি। সেখানে তোমার চেয়ে কোমল চাদর এবং সুন্দর যুলফী আর কারও ছিলো না। আর আজ তুমি এ চাদরে ধূলিমলিন অবস্থায় পড়ে আছো। আল্লাহর রাসূল সাক্ষ্য দিচ্ছে, কিয়ামতের দিন তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে সাক্ষ্যদানকারী হবে।’
তারপর রাসূল (সা) তাঁর সাহাবাদের উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘হে মানবমণ্ডলী! তোমরা তাদের যিয়ারত করো। তাঁদের কাছে এসো। তাঁদের ওপর সালাম পেশ করো। সেই সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ! কিয়ামত পর্যন্ত যে কেউ তাঁদের ওপর সালাম পেশ করবে, তাঁরা সেই সালামের জওয়াব দেবে।’
মুসআব শহীদ হওয়ার পরপর-ই জিবরীল এলেন। ওহী নিয়ে। নাযিল হলো—‘ওয়ামা মুহাম্মাদুন ইল্লা রসূল, ক্বদ খলাত মিং ক্ববলিহির রসূল।’ সূরা আলি ইমরানের ১৪৪ নাম্বার আয়াত।
মুসআব যে বাক্যটি পড়ছিলেন, ঠিক সে বাক্যটিই জিবরাঈল নিয়ে এলেন।
সুবহানাল্লাহ! ভাই আমার! এক মিনিট একটু চোখটা বুঝো তো। এরপর ভাবো। যে বাক্যটা মুসআব তাঁর মৃত্যুর আগে তিলাওয়াত করছিলেন, জিবরাঈল সে আয়াতটিই নিয়ে এলেন। মুসআব এর উচ্চারিত বাক্য, আর মহান রবের পাঠানো আয়াত—হুবহু মিলে গিয়েছিলো।
ভাই আমার! আমি মুসআবকে জীবন্ত কিংবদন্তি কেনো বলেছি, জানো?
এর উত্তরটা আমি দেবো না। চলো, আমাদের রব আল্লাহ তায়ালার কাছে এর উত্তর চাই। মহান আল্লাহ বলেন—”যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে, তাদেরকে কখনও মৃত বলো না। বরং তাঁরা জীবিত। তাঁরা তাঁদের রবের কাছ থেকে জীবিকা প্রাপ্ত।” [আলি ইমরান, ১৬৯ আয়াত]
মুসআব তাঁর রবের সাথে এমন অবস্থায় সাক্ষাৎ করেছেন যে, তাঁর রব তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন। মুসআবদের লক্ষ্য করে আয়াত নাযিল হয়েছে। যে আয়াতে মুসআবদের অনুসরণ করতে বলা হয়েছে। মুসআবদের পথে হাঁটতে বলা হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে এও জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, কেউ যদি তা করতে পারে, তবে আল্লাহ তাঁর প্রতিও ঠিক তেমনই সন্তুষ্ট হবেন, যেমন তিনি মুসআবদের প্রতি সন্তুষ্ট।
“আর আনসার ও মুহাজিরদের মধ্যে যারা অগ্রগামী এবং যাবতীয় কাজে যারা তাঁদেরকে অনুসরণ করেছে, আল্লাহ তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন, আর তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন। আর তাঁদের জন্যে প্রস্তুত করে রেখেছেন জান্নাত, যার তলদেশ দিয়ে ঝর্ণা প্রবাহিত। সেখানে তাঁরা চিরকাল থাকবে। এটাই হলো মহাসাফল্য।” [সূরা তাওবা, ১০০ আয়াত]
ভাই আমার! আজ তুমি কাদের অনুসরণ করছো? কাদেরকে তোমার জীবনের মডেল বানিয়েছো?
ফিল্ম স্টার কিংবা পপ স্টারদের, যাদের ওপর প্রতিনিয়ত আল্লাহর লা’নত বর্ষিত হয়? নাকি সেসব নর্তকী আর পতিতাদের, যাদের জীবন আর পশুপাখির জীবনের মধ্যে সামান্যতমও পার্থক্য নেই?
ভাই আমার! তুমি কেনো দীনের পথে আসছো না? কেনো তুমি তোমার রবের হুকুম থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছো? কেনো সালাতে অবহেলা করছো?
তোমার অর্থসম্পদ কি মক্কার প্রিন্স মুসআব ইবনু উমাইর এর থেকেও বেশি? তুমি কি মুসআবের চেয়েও বেশি আদরে লালিত-পালিত হয়েছো? নাকি তোমার বাবা মুসআবের বাবার চেয়েও বড়ো ব্যবসায়ী, যার কারণে তুমি দীনের পথে আসছো না?
ভাই আমার! যাদেরকে আল্লাহ তোমার জন্যে মডেল বানালেন, তাঁদেরকে দূরে ঠেলে; আজ তুমি কাদের পাল্লায় পড়েছো? কাদের ড্রেসআপ, কাদের স্টাইল, কাদের চালচলন বেঁছে নিয়েছো?
তুমি কি তোমার অবস্থান নিয়ে ভেবেছো কোনোদিন?
তুমি যে অবস্থায় আছো, সে অবস্থায় যদি মারা যাও; তাহলে তোমার স্থান কোথায় হবে?
বিশ্বাস করো, তুমি যদি এই জাহেলি অবস্থাতেই মারা যাও, তবে কেউ তোমাকে মনে রাখবে না। কেউ তোমার জন্যে কাঁদবে না। কেউ তোমার জন্যে সালাত পেশ করবে না। কেউনা। মারা যাওয়ার সাথে সাথে তোমার নাম নিশানা দুনিয়া থেকে মুছে যাবে। আর যদি মুসআব হতে পারো, তাহলে তোমার নাম তাঁদের সঙ্গে লিখা হবে—যাদের নাম শুনলেই আমরা পড়ি—রদিয়াল্লাহু ‘আনহুম ওয়া রদু’আন (আল্লাহ তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট আর তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট)।
ভাই আমার! দুনিয়ার ভালোবাসা আজ তোমাকে অন্ধ করে দিয়েছে। দুনিয়ার নেশা তোমাকে মাতাল করে দিয়েছে। তুমি যদি জানতে—তোমার জীবন থেকে কী হারিয়ে গেছে, তাহলে তুমি খুব কমই হাসতে। কাঁদতে বেশি।
অঝোর ধারায় কাঁদতে।

সংবাদটি শেয়ার করুন:
Share on Facebook
Facebook
0Share on Google+
Google+
0Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin
Email this to someone
email
Print this page
Print

সর্বশেষ সংবাদ

Developed by: