সোমবার, ১৫ অক্টোবর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৩০ আশ্বিন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ |
শিরোনাম
আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নিলেন আরিফুল হক চৌধুরী  » «   সিম রেজিস্ট্রেশনে আর কাগজ-কলম লাগবে না  » «   টাইফুন ‘জেবি’র আঘাতে লণ্ডভণ্ড জাপান, নিহত ৯  » «   রোনালদোর বেতন তিন গুণ বেশি!  » «   দ্বিতীয়বার সিলেটের মেয়র হিসেবে শপথ নিলেন আরিফ  » «   যে নামগুলো পাসওয়ার্ড হিসেবে ব্যবহার করবেন না  » «   ট্রাম্পের ‘প্যান্ট’ খুলে দিল যে বই  » «   নিরাপদ সড়ক আন্দোলন: ঘটনাই ঘটেনি, মামলা করে রেখেছে পুলিশ  » «   ‘অ্যাওয়ে গোল’ বাতিল করো, দাবি মরিনহো-ওয়েঙ্গারদের  » «   শহিদুলকে প্রথম শ্রেণির বন্দীর সুবিধা দিতে নির্দেশ  » «   আরপিও সংশোধন নিয়ে নির্বিকার নির্বাচন কমিশন  » «   মাহাথিরের রসিকতায় শ্রোতাদের মধ্যে হাসির রোল!  » «   দেশের বাইরে রান করাটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখি : মুশফিক  » «   দুর্দান্ত জয়ে সিপিএলের শীর্ষে মাহমুদুল্লাহরা  » «   খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবিতে বিএনপির ২ দিনের কর্মসূচি  » «  

বাংলা ভাষার সঙ্কট ও আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি

হারুন-আর-রশিদঃ
বাংলা ভাষা কি অস্তিত্ব হারাতে বসেছে? প্রশ্নটি এখন বহুল আলোচিত। এবারের বইমেলায় দেখলাম, বহু লেখক ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করে গ্রন্থের নাম দিয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ হাউ টু বিল্ড আপ ইউর ক্যারিয়ার, ক্যারিয়ার গাইড, থিংকিং পাওয়ার, পজিটিভ পাওয়ার, অপারেশন মুজিবনগর (পাঞ্জেরী), সারেন্ডার অ্যাট ঢাকা (ইউপিএল), দ্য জাংগল বুক (পাঞ্জেরী), লিটল উইমেন (পাঞ্জেরী), এ জার্নি টু দ্য সেন্টার অব দ্য আর্থ (পাঞ্জেরী)। । বাংলাদেশের কয়েকটি বুকস্টলে দেখেছিÑ ভারতীয় খ্যাতিমান ব্যক্তিদের জীবনীগ্রন্থ। ভারতীয় লেখকদের বই বহু স্টলেই শোভা পেয়েছে। আরো দেখা গেল, বাংলা একাডেমির মূল চত্বরে ভারতীয় প্রকাশকের একটি স্টল যেখানে শুধু হিন্দু দেবতাদের নানা কাহিনী এবং গীতা, রামায়ণ, লক্ষ্মী ও দুর্গার জীবনী প্রভৃতি বই নিয়ে সজ্জিত করা হয়েছে। আরেক বুকস্টলে মন্দির দিয়ে স্টলটি সুসজ্জিত করা হয়েছে। কলকাতায় কোনো বিজাতীয় সংস্কৃতির বইমেলায় দৃশ্যমান নয়। আমরা কত যে অনুকরণপ্রিয় তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ বাংলা একাডেমির গ্রন্থমেলা এবং নববর্ষ উদযাপনকালেও তা লক্ষণীয়। বাংলা ভাষা দখল করেছে সংস্কৃতি শব্দ, ইংরেজি শব্দ, হিন্দি শব্দ। এখন প্রচুর বই বাজারে পাওয়া যাচ্ছে হিন্দিতে। এই ভাষা শিক্ষাকেন্দ্রও বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ভারতের দূতাবাসের আনুকূল্যে। ভারতীয় দূতাবাস সাতটি বিভাগীয় শহরে ভিসা অফিসের পাশাপাশি ভারতীয় সংস্কৃতি কেন্দ্র গড়ে তুলেছে। বাংলাদেশে ৪৬টি টিভি চ্যানেলে অশালীন ছবি ও নৃত্যসহ যত রকম নষ্টামি আছে তা আমাদের শিশু-কিশোরদের কোমল মনে অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে এখন বাংলা ভাষার যে সৌন্দর্য তার বিনাশ ঘটানো হচ্ছে। হিন্দি ভাষা অনেকের মুখে শোভা পায়। সম্প্রতি পত্রিকায় দেখলাম বাংলা একাডেমির এক অনুষ্ঠানে একজন মন্ত্রী বললেন, ঈশ্বরের কৃপায় দুই বাংলার মানুষ এখন অনেক ভালো আছে। ইরানের কালচারাল সেন্টারের অনুষ্ঠানে আরেক মন্ত্রী ঈশ্বরের নাম উচ্চারণ করলেন। দু’জনই মুসলমান হিসেবে পরিচিতি। ইরানের রাষ্ট্রদূত ভ্রƒ-কুঁচকে তাকালেন মন্ত্রীর দিকে। ইসলামকে ছেঁটে তাড়িয়ে দিতে পারলেই মনে হয় সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। প্রধানমন্ত্রীর আশপাশের অনেকেই বাম আর রামভক্ত বিধায় আপত্তিকর শব্দ উচ্চারণ করে দেশে জঙ্গিবাদে উসকানি দিয়ে যাচ্ছেন। সচেতন মানুষ বুঝতে পারছেন পাঠ্যপুস্তকে বাংলা ভাষার যে মার্জিত রুচিবোধ ছিল তার বিকৃতি ঘটেছে। যারা ঘটাচ্ছে এসব বিবর্তন, তাদের নাম বলে দেয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। বাংলাদেশের মানুষ এসব বিতর্কিত ব্যক্তিকে খুব ভালো করেই চেনেন। একজন সচেতন মানুষ আমাকে বললেন, প্রধানমন্ত্রীকে এরা ভালো থাকতে দেবে নাÑ যেমনি বঙ্গবন্ধুকেও ভালো থাকতে দেয়নি তোষামোদকারীরা।
একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বললেনÑ প্লানিং কমিশন ও সচিবপর্যায়ে বহু মানুষ নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এক বাক্যে তাদের স্বাধীন উপাধিতে ভূষিত করা যায়। তিনি বললেনÑ আমরা আদর্শিক বই ‘ক্রয় কমিটিতে’ উপস্থাপন করতে পারছি না। নারীদের উদোম শরীরের বইও এখন বাছাই কমিটিতে অনুমোদনের আবেদন আসছে প্লানিং কমিশন ও সচিবালয় থেকে। প্রধানমন্ত্রী এসব বিষয় জানেন না বলে ওই কর্মকর্তা মনে করেন।
আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অধঃপতনের পথে কারা নিয়ে যাচ্ছে? বাংলাদেশে জঙ্গিবাদকে কারা উসকে দিচ্ছেÑ সেটা অনুসন্ধান করলেই বেরিয়ে আসবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একা ভালো থাকলে পুরো দেশ ভালো থাকবেÑ এটা আশা করা যায় না। আমরা না বদলালে দেশ বদলাবে না।
দেশের মানুষ অভিমত প্রকাশ করেছেÑ বাংলা ভাষায় বিদেশী ভাষা, সংমিশ্রণ ঘটিয়ে মাতৃভাষাকে দূষণের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার যে চক্রান্ত চলছে তা রোধ করতে না পারলে আমাদের সন্তানেরা আলোকিত মনের মানুষ হতে পারবে না। চিন্তা-চেতনায় আদর্শ ও নৈতিকতার উচ্ছেদ ঘটানো হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বস্তুবাদের পথে হাঁটবে। মোবাইলে, ইন্টারনেটে ভারত থেকে নোংরা কালচারের চ্যাটিং এমনভাবে অনুপ্রবেশ করেছেÑ যেমনি বন্যার সময় পানি ঘরবাড়ি গৃহপালিত পশু ও মানুষ ভাসিয়ে নিয়ে যায়। শিশুধর্ষণ, মাদকাসক্তি, ইভটিজিং, নারী নিপীড়ন, স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদ এসব কারণে ঘটছে।
রাস্তার প্রায় প্রতিটি দোকানের সাইনবোর্ডে ইংরেজি নামই বাংলায় লেখা হচ্ছে। বহু ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নাম ইংরেজি শব্দে লেখা হচ্ছে। আবার কিছু কিছু শব্দ বা বাক্য মূলত ভারতীয় ৪৪টি চ্যানেল থেকে পুরোপুরি কপি করে সাইনবোর্ডে ব্যবহার করা হচ্ছে। আমাদের স্বকীয়তা নিয়ে দুটো বড় সংগ্রাম আমরা ১৯৪৭ সাল এবং ১৯৭১ সালে করেছিলাম। এর সুফল এখন বিসর্জন দেয়ার চরম মুহূর্তে আমরা পৌঁছে গেছি। নারীসমাজ ভারতীয় চ্যানেলে যেভাবে কিরণমালা, কটকটি, বধূবরণ দেখে সময় নষ্ট করেÑ সেভাবে যদি নিজের সন্তানদের জন্য সময় ব্যয় করতেন তাহলে কিশোর ও তরুণদের এত ধস নামত না। পত্রিকা খুললেই শুধু খুন আর ধর্ষণের আদিম যুগের বর্বর চিত্র। আলেমসমাজ একত্র হয়ে একটি ব্যানারে যদি শক্ত হয়ে দাঁড়াতে পারতেন তাহলে ইসলাম সুপ্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হতেন। মহান আল্লাহ তায়ালা কুরআন শরিফে ঘোষণা দিয়েছেনÑ ‘হে মানুষ আমি তোমাদের জন্য আজ একটি চমৎকার ব্যবসার কথা বলবÑ সেটি হলো ‘ইসলাম’। এই ব্যবসাটি নিয়ে যদি তোমরা ব্যস্ত থাকো তাহলে ইহকাল ও পরকাল দুটো স্থানেই তোমাদের শান্তি অবধারিত। এ ওয়াদা আমার তরফ থেকে থাকল।’ ইসলাম নামের আভিধানিক অর্থও শান্তি (সূরা তওবাহ-১১১)। ‘তোমরা এই শান্তির ব্যবসাটি আঁকড়ে ধরোÑ তাহলে তোমরা সবসময় বিজয়ী হয়ে থাকবে।’ আলেমসমাজকে বিষয়টি অনুধাবন করার অনুরোধ করছি। সব ধর্মের, বর্ণের, ভাষার মানুষদের সমভাবে সহাবস্থানের নাম ইসলাম।
বাংলা ভাষার দূষণ নিয়ে পরিশেষে যে কথাটি বলব, তা হলোÑ সুপ্রিম কোর্ট থেকে শুরু করে প্রতিটি প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয়, সেক্রেটারিয়েট, দোকানপাট, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নামফলক বাংলায় রূপান্তর করার সবিনয়ে অনুরোধ করছি প্রশাসনিক দফতরের কাছে। এটা জরুরি দাবি ভাষার মর্যাদা রক্ষার্থে। বাংলা ভাষা সুরক্ষার হাল ধরতে হবে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশকেই। এ ব্যাপারে বিজ্ঞ মানুষদের অবশ্যই এগিয়ে আসতে হবে।
সর্বস্তরে বাংলার প্রচলন ঘটুকÑ এটা গণমানুষের দাবি। একুশ থেকে জাতি এ শিক্ষা পেয়েছে। বাংলা ভাষাকে নিয়ে ব্যাপকভিত্তিক পরিকল্পনা ও গবেষণা সময়েরও দাবি। ভাষা ও ধর্ম সংস্কৃতির উপজীব্য বিষয়। একে অহবেলা করলে জাতি হিসেবে আমাদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে। আল্লাহ ভরসা, আল্লাহ হাফিজ না বলে Thanks God, Bye Bye ইত্যাদি উচ্চারণ করি। হিন্দি ছবি ও সিরিয়াল দেখার জন্য হুমড়ি খেয়ে চ্যানেলের সামনে বসি। ’৭১-এর আগে অবুঝ মন, বেহুলা, আবির্ভাব, সুতরাং, কখগঘঙ প্রভৃতি ছবি দেখার জন্য সিনেমা হলে লম্বা লাইনে সারিবন্দী হয়ে দাঁড়াতাম টিকিট কেনার জন্য। কোথায় গেল আমাদের সেই পরিচ্ছন্ন মানসিকতা? নির্মাণ কর্মকর্তারা কেন আজ ভারতের ছবি হুবহু নকল করে বানাচ্ছেন? আত্মমর্যাদাশীল একটি জাতি স্বকীয়তা বজায় রাখার জন্য মুক্তিযুদ্ধের কথা কিভাবে ভুলে গেলাম? হিন্দিকে বরণ করে নেয়ার অর্থ হলো আত্মমর্যাদার বিনাশ ঘটানো। এ জন্য আমরা মুক্তিযুদ্ধ করিনি। ইতিহাসের চাকা কেন আমরা পেছন দিকে ঘুরাচ্ছি? এসব নিয়ে চিন্তাশীল মানুষেরা একটুও ভাবছেন কি? বাংলা ভাষা কি হারিয়ে যাবে গভীর খাদে বা অতল তলে তলিয়ে যাবে?

সংবাদটি শেয়ার করুন:
Share on Facebook
Facebook
0Share on Google+
Google+
0Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin
Email this to someone
email
Print this page
Print

সর্বশেষ সংবাদ

Developed by: